উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সংকট ও অর্থনীতির নানা কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট পেশ করবেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা অঙ্কের দিক থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে সরকার ঘোষিত দর্শন, ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বি-নিয়ন্ত্রণকরণ : সবার জন্য উন্নয়ন’ এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়া। আগামী ১৫ জুন চলতি অর্থবছরের সম্পূক বাজেট পাস হবে। এরপর ১৬ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আলোচনা শুরু হবে এবং ৩০ জুন বাজেট পাস করতে হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রান্তিক ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষের কল্যাণের কথা মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, কারিগরসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ এতে গুরুত্ব পাবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কার্যকর পদক্ষেপ রাখা হবে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার দিকনির্দেশনাও বাজেটে থাকবে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এ বাজেট শুধু আর্থিক পরিকল্পনাই নয়; বরং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এমন এক সময়ে নতুন সরকার বাজেট দিতে যাচ্ছে, যখন অর্থনীতি একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, ব্যাংক খাতের অনিয়ম এবং কম বিনিয়োগের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সম্ভাব্য বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে অনলাইনে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং করসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব আসতে পারে।
এর বাইরে প্রয়োজনীয় অর্থের একটি বড় অংশ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। সব মিলিয়ে আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৬ শতাংশের সমান।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বাজেট ঘাটতির একটি বড় অংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে। এক্ষেত্রে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ঋণ অন্যতম উৎস হতে পারে। ঘাটতি অর্থায়নের প্রায় ৫২ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পূরণ করা হবে।
অন্যদিকে বাকি ৪৮ শতাংশ ঘাটতি বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে সম্ভাব্য অর্থায়নের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের সমন্বয়ে এ অর্থ সংগ্রহ করা হতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যয়ের মধ্যে ঋণের সুদে ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আসন্ন বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
এ লক্ষ্যে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার পৃথক তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। এ ছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণা আসতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ২৫ লাখ নাগরিককে আওতায় এনে ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও শক্তিশালী করতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি চালুর পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোর বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হতে পারে। অন্যদিকে যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রেখে সৃজনশীল ও উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন অর্থবছরে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। চলতি বছরের মে মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরে তা কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলেই মনে করছেন তারা।
তাদের পর্যবেক্ষণ, প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের ফলে বাজারে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য কঠোর বাজার তদারকির পাশাপাশি মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগ (জিইডি) বলছে, নতুন সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবারের কল্যাণমুখী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তাদের মতে, এই বাজেট দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি আনতে এবং অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদের মতে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই আগামী অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে সরকার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। তার ভাষায়, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ যাদের নিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তাদের বড় অংশই মফস্বল এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানদার। এসব এলাকায় ভ্যাট প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও কার্যালয়ও পর্যাপ্ত নয়। তার মতে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে বড় করদাতা ও বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায়ের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সে পথে না গিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত ভ্যাটের চাপ সৃষ্টি হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর পড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে ব্যবসায়ীরা একদিকে স্বস্তির আশা প্রকাশ করলেও অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের বাড়তি চাপ ও নতুন কর আরোপ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যবসা-বাণিজ্য নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলারের অস্থিরতার কারণে শিল্প ও বাণিজ্য খাত চাপের মধ্যে রয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে কর কাঠামো সহজ করা, নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন ও প্রণোদনা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
একইসঙ্গে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে করের আওতা বাড়ানো এবং বড় করদাতাদের কাছ থেকে আদায় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা। ব্যবসায়ীদের মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির গতি পুনরুদ্ধারে নতুন বাজেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কেকে/ এমএস