জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে হাসিনা সরকারের। অবসান হয় দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার। রাষ্ট্র পরিচালনায় গঠন করা হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ সরকারের (অন্তর্বর্তী) ১৮ মাস রাষ্ট্র পরিচালনার পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে বিএনপি। ক্ষমতায় আসে নতুন রাজনৈতিক সরকার।
তবে সরকার পরিবর্তন হলেও দায় এড়ানোর পুরোনো সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারছেন না ক্ষমতাসীনরা। বিভিন্ন ঘটনায় সরকারের এমপি-মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের একের পর এক দায়সারা বক্তব্য ঘিরে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে অতিসম্প্রতি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া, সীমান্তে ভারতের পুশইন ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টার বক্তব্য এবং ঈদযাত্রায় যাত্রী ভোগান্তি নিয়ে সড়কমন্ত্রীর মন্তব্যে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরবিবর্তন হলেও বর্তমান ক্ষমতাসীনরা আগের সংস্কৃতিতেই চলছেন। ফলে কোনো অন্যায়-অনিয়ম বা মতের বিরুদ্ধে যায় এমন বিষয় সহজে তারা মেনে নিতে পারেন না। উলটো বিকল্প যুক্তি দাঁড় করানো হয়। বর্তমান সরকারের দায়িত্বে থাকা দায়িত্বশীলদের মন্তব্যেও এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তাদের ভাষ্য সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে জনগণ শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন প্রত্যাশা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে সমালোচনাকে গ্রহণ করার পরিবর্তে তা অস্বীকার করা বা বিকল্প ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যা কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উচিত সমালোচনাকে আমলে নিয়ে জবাবদিহি ও নীতিগত সংশোধনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। অন্যথায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও দায় এড়ানোর পুরোনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না।
টিআইবির প্রতিবেদন মানতে নারাজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
সরকারের প্রথম ১০০ দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন মানতে নারাজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘টিআইবির প্রতিবেদন শুধু পেপার কাটিংয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে। প্রতিবেদনে তাদের নিজস্ব কোনো তদন্ত নেই। সেহেতু এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
গত সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুলিশ সদস্যদের পুরস্কার দেওয়া অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। টিআইবি কোনো সরকারি সংস্থা নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রকৃত অপরাধচিত্র জানতে হলে পুলিশ বিভাগ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য দেখতে হবে।
এর আগে গত রোববার টিআইবি এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি হতাকাণ্ড ঘটেছে। ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৯ জন নারী ও শিশু।
প্রতিবেদনটি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, টিআইবির প্রতিবেদন মূলত পত্রিকার কাটিংয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। তারা নিজেরা কোনো ঘটনা তদন্ত করে না। প্রকৃত ঘটনা বিবেচনা না করে- এমন প্রতিবেদন দেওয়া ঠিক নয়। তবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রয়েছে এবং এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, ‘আমার সামনে সেই রিপোর্টটা (টিআইবি) নেই। আমরা মাস ভিত্তিতে অপরাধের স্টেটমেন্ট করে থাকি। ডাকাতি, খুন, হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ তালিকাভুক্ত করা হয়। কয়েকদিন আগে আমার কাছে আরেকটি রিপোর্ট এসেছিল, সেখানে দেখেছি ২০২৫ সালের তুলনায় অপরাধের চিত্র বর্তমান সরকারের সময়ে অনেক বেশি উন্নতি লাভ করেছে, অনেক অপরাধ কম।’
এদিকে এ প্রতিবেদন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের বক্তব্যের পালটা প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটি বলেছে, তাদের প্রতিবেদনকে শুধু পত্রিকার ‘কাটিং-নির্ভর’ বলার কোনো ভিত্তি নেই। এ বক্তব্য মূল বিষয়কে পাশ কাটানোর ব্যর্থ প্রয়াস ছাড়া কিছুই নয়। সরকারের ১০০ দিনের কাজের মূল্যায়নে নিজেদের প্রতিবেদন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিক্রিয়া জানায় টিআইবি।
নিজেদের প্রতিবেদনটি নিয়ে এমন সব আলোচনায় অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা জানিয়েছে টিআইবি। তারা জানায়, ‘মন্ত্রী যথার্থই বলেছেন যে, টিআইবি তদন্ত করে না। টিআইবি কোনো তদন্ত সংস্থা নয়, মূলত গবেষণানির্ভর দুর্নীতিবিরোধী ও সুশাসনবিষয়ক অধিপরামর্শ ও জনসচেতনতা এবং জনসম্পৃক্ততাভিত্তিক পরিবর্তনপ্রত্যাশী একটি সংগঠন।’
টিআইবি সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত এবং স্বীকৃত গুণগত ও পরিমাণগত তথ্য সংগ্রহের পরিসংখ্যান বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করে জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টিআইবি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এবং সংগৃহীত তথ্যের যথার্থতা বহুমাত্রিক প্রক্রিয়ায় যাচাই সাপেক্ষে, বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রণয়ন করে। টিআইবির প্রতিবেদন শুধু পত্রিকার কাটিংয়ের ওপর নির্ভর করে প্রণীত হয়- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংগ্রহ করে থাকে জানিয়ে টিআইবি বলেছে, তবে তা বিবেচনায় নেওয়ার আগে, একদিকে যেমন যথাযথ প্রক্রিয়ায় গুণগত মান যাচাই নিশ্চিত করা হয়, অন্যদিকে তেমনি একই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি, বেসরকারি এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সব সূত্রে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়। সুতরাং, টিআইবির প্রতিবেদনকে ঢালাওভাবে পত্রিকার কাটিংনির্ভর এমন অবস্থান শুধু অযৌক্তিক নয়; বরং মূল বিষয়কে পাশ কাটানোর ব্যর্থ প্রয়াস ছাড়া কিছুই নয়।
শত প্রতিকূলতা ও বিতর্ক সত্ত্বেও অন্য যে কোনো দেশের মতোই দেশের জনপ্রতিনিধি, সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন না এমন প্রশ্ন রেখেছে টিআইবি। তারা বলছে, টিআইবির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান বা এর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের নামে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যকে এমন ঢালাওভাবে অবমূল্যায়ন করার যুক্তি নেই। পুলিশ কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের আগ্রহের বিষয় সম্পর্কে টিআইবির মূল পর্যবেক্ষণ অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে উদ্বেগজনক, তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেনি বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে টিআইবি।
পুশইন ইস্যুতে তথ্য উপদেষ্টার বিতর্কিত ব্যাখ্যা
সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতের পুশইন ইস্যু নিয়েও সরকারের অবস্থান আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সীমান্তে ভারতের পুশইনের বিষয়টি বিজেপির রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়। এটি তারা বাংলাদেশকে চাপে রাখতে করছে বিষয়টি এমন নয়। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এ কথা জানান।
পুশইনের বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশে যেটা করার চেষ্টা করছে, আমরা নিশ্চয়ই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন লক্ষ করেছি। সেখানে নির্বাচনে একটা ইস্যু ছিল এটা। এটা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যাপার, যেটার খানিকটা চাপ আমাদের ওপরে আসছে। আমি মনে করি না যে, বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো একটা চাপ তৈরির জন্য ভারতীয় সরকার এটা করছে। পশ্চিমবঙ্গে যে নতুন সরকার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের নির্বাচনের এক ধরনের প্রতিশ্রুতি ছিল এটা।’
তিনি বলেন, ‘তাদের (পশ্চিমবঙ্গ সরকার) একটা রাজনীতি আছে, সেটারই এক ধরনের বহিঃপ্রকাশ এটা। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের নতুন সরকার ভারতের বিভিন্ন পর্যায়ে যখন কথাবার্তা বলেছে, আমার নিজেরও কিছু কথাবার্তা হয়েছে, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ড. ইউনূস সরকারের সঙ্গে যে ধরনের পরিস্থিতি ছিল, সেটা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে চান। সেটা দুই দেশই চায়। সেজন্য আমি মনে করি যে সংকটটা প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে, এটার একটা সমাধান দ্রুত হবে। এটা কোনোভাবেই তারা ইনটেনশনালি (ইচ্ছাকৃতভাবে) বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বা বাংলাদেশকে চাপে রাখতে চাইছেন এরকম আমি মনে করি না।’
এর আগে ঈদযাত্রা নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বক্তব্যও ব্যাপক সমালোচিত হয়। তিনি দাবি করেন, যাত্রীদের কোনো ভোগান্তি নেই, কোথাও যানজট নেই এবং অতিরিক্ত ভাড়াও নেওয়া হচ্ছে না। বরং কিছু পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম নিচ্ছে।
অথচ একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে দীর্ঘ যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং যাত্রী দুর্ভোগের নানা চিত্র উঠে আসে। এতে মন্ত্রীর বক্তব্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন অনেকেই।
কেকে/ এমএস