ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। পাহাড়ি কলাবাগানে প্রতিদিনের মতো কাজে ব্যস্ত ছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ গাছের গোড়া পরিচর্যা করছেন। হঠাৎ করেই বিকট এক বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে পুরো পাহাড়ি জনপদ। ধোঁয়া আর রক্তের মধ্যে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ৩০ বছর বয়সি শ্রমিক আব্দুল খালেক।
দুই পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার। সহকর্মীরা ছুটে যেতে চাইলেও আতঙ্কে থমকে দাঁড়ান, কারণ আশপাশে আরও মাইন থাকতে পারে। পরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কয়েকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানেন তিনি।
গত মঙ্গলবার সকালে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু আমতলী সীমান্তের ৩৯ ও ৪০ নম্বর সীমান্ত পিলারের মধ্যবর্তী এলাকায় ঘটে এ মর্মান্তিক ঘটনা।
স্থানীয়দের ধারণা, সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি এলাকায় আগে থেকেই পুঁতে রাখা অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইনে পা পড়তেই ঘটে বিস্ফোরণ। আব্দুল খালেকের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ছড়িয়ে পড়া এক ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয়ের নতুন অধ্যায়।
১৬ দিনে ৫ জনের মৃত্যু : নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে গত কয়েক সপ্তাহ যেন মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। গত ২৪ মে তুমব্রু সীমান্তের ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী এলাকায় একই দিনে প্রাণ হারান তিন পাহাড়ি শ্রমিক। নিহতরা হলেন অক্যমং তংচঙ্গ্যা (৪০), চিক্যং তংচঙ্গ্যা (৩৪) ও শৈফুচিং তংচঙ্গ্যা (৩২)। এরপর বাইশফাঁড়ি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে মারা যায় এক কিশোর।
সবশেষ গত মঙ্গলবার প্রাণ গেল আব্দুল খালেকের। স্থানীয় প্রশাসন, বিজিবি ও জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন। আহত হয়েছেন অন্তত চারজন। আর ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মাইন ও অবিস্ফোরিত গোলার বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। আহতের সংখ্যা ৪০ ছাড়িয়েছে। নিহতদের তালিকায় রয়েছেন কৃষক, শ্রমিক, কাঠুরে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সদস্য, রোহিঙ্গা শরণার্থী এমনকি বিজিবি সদস্যও।
পা হারিয়ে বেঁচে থাকা যেন আরেক মৃত্যু : মাইন বিস্ফোরণে আহতদের জীবনও কম করুণ নয়। চাকঢালা সীমান্তে প্রায় দেড় বছর আগে মাইন বিস্ফোরণে পা হারান মো. জুবায়ের (৩৫)। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরও তার পা বাঁচানো সম্ভব হয়নি। হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়েছে। এখনো তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে চলেন।
জুবায়ের বলেন, অনেকে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু আমার হারানো পা কি কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে? তার এই প্রশ্ন যেন সীমান্তের অসংখ্য আহত মানুষের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি।
মৃত্যুর ফাঁদে বিজিবিও : মাইনের ভয়াবহতা থেকে রেহাই পাননি সীমান্তরক্ষীরাও। ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর তুমব্রু সীমান্তে টহলরত অবস্থায় মাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের নায়েক মোহাম্মদ আক্তার হোসেন। বিস্ফোরণে তার একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ ১৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ৩১ অক্টোবর তিনি মারা যান। এ ঘটনার পর সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা ও মাইন ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
আতঙ্কে সীমান্তবাসী : ঘুমধুম, তুমব্রু, রেজু আমতলী, বাইশফাঁড়ি ও চাকঢালাসহ বিস্তীর্ণ সীমান্তজুড়ে এখন একটাই আতঙ্ক কখন কোথায় বিস্ফোরিত হবে মাইন। স্থানীয়রা বলছেন, জীবিকার তাগিদে পাহাড়ে যেতে হয়। কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপই যেন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। চাকঢালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান বলেন, সীমান্ত এলাকার মানুষ সবসময় আতঙ্কে থাকেন। মাটির নিচে যেন মৃত্যু লুকিয়ে আছে। বারবার প্রাণহানির ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
মাইন অপসারণের দাবি : স্থানীয় সাংবাদিক এম রহমান সীমান্তে, নূর মোহাম্মদ, মাহমুদুল হাসান ও আজিজুল হক রানা বলেন, সীমান্ত এলাকায় মাইন অপসারণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের সীমান্তে যারা মাইন পুঁতেছে, তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, নিরাপদ ভূখণ্ডে নিরাপদ জীবনযাপন সীমান্তবাসীর সাংবিধানিক ও মানবিক অধিকার।
উঠান বৈঠকে প্রশাসনের সতর্কবার্তা : কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় সাম্প্রতিক মাইন বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও দুঃখজনক। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য মাইনঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে লাল পতাকা ও সতর্কতামূলক চিহ্ন স্থাপন করা হচ্ছে, যাতে স্থানীয় বাসিন্দারা সচেতন থাকতে পারেন এবং দুর্ঘটনা এড়াতে পারেন।
সাম্প্রতিক প্রাণহানির পর ঘুমধুম ইউনিয়নের ধর্মজ্যোতি বৌদ্ধবিহার প্রাঙ্গণে জনসচেতনতামূলক উঠান বৈঠক আয়োজন করে স্থানীয় প্রশাসন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. এনামুল হাসান বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকার জনগণকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও শূন্যরেখার কাছাকাছি যাতায়াত থেকে বিরত থাকতে হবে। সচেতনতার মাধ্যমেই অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। তিনি নিহত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সরকারের সহায়তা অব্যাহত থাকার আশ্বাস দেন।
নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম-তুমব্রু সীমান্তে এখন প্রতিটি পাহাড়, প্রতিটি ঝোপঝাড়, প্রতিটি চাষের জমি যেন একেকটি অদৃশ্য মৃত্যুফাঁদ। জীবিকার তাগিদে মানুষ সেখানে যাচ্ছে, কিন্তু ফিরছে না সবাই। আব্দুল খালেক, অক্যমং, চিক্যং, শৈফুচিং কিংবা সেই নাম না জানা কিশোর তাদের মৃত্যু শুধু কয়েকটি পরিসংখ্যান নয়; এগুলো সীমান্তবাসীর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতার নির্মম দলিল। সীমান্তের মানুষের একটাই প্রশ্ন আর কত প্রাণ গেলে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা মৃত্যুফাঁদগুলো সরানো হবে?
কেকে/ এমএস