গত কয়েকদিন ধরে জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী জেলায় অন্ধকার নামলেই যে আতঙ্ক নেমে আসে, সেটি কেবল একটি সীমান্ত এলাকার মানুষের উদ্বেগ নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং মানবিক দায়বদ্ধতার এক জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত দিয়ে কথিত ‘পুশইন’-এর অভিযোগকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা নতুন করে আমাদের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় রাত গভীর হলে সীমান্তঘেঁষা গ্রামের সাধারণ মানুষ লাঠি, টর্চলাইট ও ফালা হাতে পাহারায় নেমে পড়ছেন। কেউ রাস্তার মোড়ে, কেউ খোলা মাঠে, কেউ আবার বিজিবির টহল দলের সঙ্গে অবস্থান নিচ্ছেন। দেশের প্রতি দায়বোধ থেকে তাদের এ ভূমিকা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু একইসঙ্গে এটিও ভাবনার বিষয় যে, সীমান্ত রক্ষার মতো সংবেদনশীল দায়িত্বে কেন সাধারণ মানুষকে এমন অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে রাত জাগতে হচ্ছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। সেখানে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেই সহযোগিতা কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বিকল্প হতে পারে না। সীমান্তের এপাশে কাঁটাতারের অভাব, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকা কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ঘাটতি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এসব দুর্বলতা দূর না করে কেবল তাৎক্ষণিক সতর্কতা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্যও অস্বস্তিকর। প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যে কোনো বিরোধ বা অভিযোগের সমাধান হওয়া উচিত বিদ্যমান কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যদিয়ে। যদি সত্যিই জোরপূর্বক মানুষকে সীমান্ত অতিক্রম করানোর চেষ্টা হয়ে থাকে, তবে তা আন্তর্জাতিক নীতি ও পারস্পরিক আস্থার পরিপন্থি। বিষয়টি যৌথ সীমান্ত বৈঠক, পতাকা বৈঠক এবং উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে মানবিকতার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। নো-ম্যানস ল্যান্ডে পড়ে থাকা সেই বৃদ্ধের ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তারমতো অনেক শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষ আছেন দক্ষিণ এশিয়ায়, যারা যেখানে কাজ পান, সেখানেই যান (জাতিরাষ্ট্রের সীমান্তের হিসাব করেন না)। কিছু দালাল গোষ্ঠী আছে, যারা তাদের নানা জায়গায় পাচার করেন। এটা একটা নতুন স্পেক্টাকল, যার মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা ও দৃষ্টিভঙ্গি আড়াল করা হচ্ছে।
সীমান্তরক্ষীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও বচসাকে হিরোয়িক দেখানো হচ্ছে। চিন্তা করেন, দুটি জাতিরাষ্ট্রের বন্দুকধারী সীমান্তরক্ষীরা দাম্ভিকতা দেখাচ্ছিল এই একজন নিরস্ত্র নিরীহ বৃদ্ধের জাতীয়তা নির্ধারণ করতে গিয়ে। সীমান্তের কাঁটাতারের দুই পাশেই মানুষ বাস করে। কোনো ব্যক্তি যদি পরিচয়হীন, অসহায় বা রাষ্ট্রহীন অবস্থায় পড়েন, তাহলে তাকে ঘিরে মানবিক ও আইনগত দায়িত্বের প্রশ্নও সামনে আসাটা জরুরি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয়।
এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারের উচিত সীমান্ত এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া। আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলোকায়ন, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল নিরাপত্তা কাঠামো এবং সীমান্তবাসীর জন্য আস্থাভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে সীমান্তবাসীর মানসিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
কেকে/এমএ