বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: ৩৫৭ টাকা কমিয়ে এলপিজির নতুন মূল্য ঘোষণা      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু      তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে: রাষ্ট্রদূত      প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগে বাধা নেই      আজ শুরু হচ্ছে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা      প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপানের প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ      এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সাইবার নিরাপত্তা: তথ্যমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বাজেটে কী আছে কী নেই
ফরহাদ নাইয়া
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১:০৫ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

সংসার চালাতে মাসের শুরুতে আমরা কম-বেশি সবাই একটি পরিকল্পনা করি। বাড়িভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের স্কুলের খরচ আর চিকিৎসার টাকা সামলে কীভাবে কিছু সঞ্চয় করা যায়- এটাই থাকে মধ্যবিত্তের হিসাব। মাস শেষে অনেক সময় দেখা যায় হিসাব মিলছে না, তখন ধারও করতে হয়। বাংলাদেশ সরকারও ঠিক একই কাজ করে। পার্থক্য শুধু একটাই, আমাদের সংসারে চার-পাঁচজন মানুষ, আর সরকারের সংসারে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ। এ বিশাল সংসার পরিচালনার বার্ষিক পরিকল্পনার নামই জাতীয় বাজেট।

বাজেটের আইনি ভিত্তি

ব্রিটিশ ভারতের শেষ বাজেটটি ১৯৪৭ সালে দিয়েছিলেন লিয়াকত আলী খান, যা ‘পুওর ম্যান বাজেট’ বা গরিবদের বাজেট নামে পরিচিত ছিল। আর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ১৯৭২ সালের ৩০ জুন রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। আধুনিক গণতান্ত্রিক বাজেট ব্যবস্থার মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টা (মহাসনদ) চুক্তিতে, যার মূল কথা ছিল- ‘নো ট্যাক্সেশন উইদাউট রিপ্রেজেন্টেশন’ (প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয়)। অর্থাৎ, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির সম্মতি ছাড়া কর আরোপ করা যাবে না। বাংলাদেশের সংবিধানও এই নীতিকে কঠোরভাবে ধারণ করে। সংবিধানের ৮৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদের কোনো আইনের দ্বারা বা কর্তৃত্ব ব্যতীত কোনো কর আরোপ করা যাবে না। আর ৮৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতি অর্থবছরে সরকারকে সংসদের সামনে সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের বিবরণী বা ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’ উপস্থাপন করতে হয়।

টাকা কোথা থেকে আসে এবং কোথায় যায়?

সরকার এই বিশাল বাজেটের টাকা মূলত আমাদের পকেট থেকেই সংগ্রহ করে, যার নাম ট্যাক্স বা কর। এটি মূলত তিন প্রকার-

প্রত্যক্ষ কর : ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর, করপোরেট কর, যানবাহন কর, ও ভূমি রাজস্ব।
পরোক্ষ কর : মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আমদানি শুল্ক, ও সম্পূরক শুল্ক। আপনি সাবান কিনলে, রেস্টুরেন্টে খেলে বা মোবাইলে রিচার্জ করলেই এই কর দিচ্ছেন।
করবহির্ভূত আয় : সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ, সুদ, জরিমানা, টোল ও ইজারা থেকে প্রাপ্ত অর্থ।

সংগৃহীত এই অর্থ সরকার দুই ভাগে ব্যয় করে। প্রথমটি হলো রাজস্ব ব্যয় (অনুন্নয়ন বাজেট), যা সরকার পরিচালনার খরচ (যেমন—দেশরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা)। দ্বিতীয়টি হলো উন্নয়ন বাজেট (এডিপি), যার মাধ্যমে রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্কুল ও হাসপাতাল নির্মাণ করে ভবিষ্যতের অর্থনীতি বড় করার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।

বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন

উন্নয়নশীল দেশে সরকারের আয়ের চেয়ে খরচ সব সময় বেশি থাকে, একেই বলা হয় বাজেট ঘাটতি। সাধারণত জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতিকে সহনীয় ও অর্থনীতির জন্য উদ্দীপনামূলক মনে করা হয়। এ ঘাটতি মেটাতে সরকার বৈদেশিক উৎস (দাতা সংস্থা ও বিভিন্ন দেশ) এবং অভ্যন্তরীণ উৎস (ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র) থেকে ঋণ নেয়। তবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের জন্য অর্থ কমে যায় এবং সঞ্চয়পত্রের কারণে সরকারের সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ে।

অনেকে মনে করেন, ঘাটতি হলে সরকার চাইলেই নতুন টাকা ছাপাতে পারে। কিন্তু উৎপাদন, পণ্য ও সেবা না বাড়িয়ে শুধু টাকা ছাপালে বাজারে অর্থ সরবরাহ বেড়ে যায়। ফলে একই পণ্যের পেছনে বেশি টাকা ছোটায় মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করে। তাই টাকা ছাপানো বাজেটের মূল ভিত্তি নয়।

ভালো ও খারাপ বাজেট চেনার উপায়

আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করে বাজেট ‘সুষম’ (আয়-ব্যয় সমান) বা ‘অসম’ (উদ্বৃত্ত বা ঘাটতি) হতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষায় বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনে সব সময় ঘাটতি বাজেট তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ হিসেবে বাজেট ভালো না খারাপ তা বুঝতে কয়েকটি দিক খেয়াল করতে হয়-

মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য : নিত্যপণ্যের ওপর শুল্ক বা ভ্যাট বাড়ল কি কমল, যা সরাসরি বাজারদরে প্রভাব ফেলে।
করনীতি : করমুক্ত আয়ের সীমা এবং মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা কতটা যৌক্তিক।
কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ : স্থানীয় শিল্প, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে নতুন কোনো সুবিধা আছে কি না, যা নতুন চাকরি তৈরি করবে।
সামাজিক খাত : শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা ভাতায় বরাদ্দের পরিমাণ।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ

বর্তমান বিএনপি সরকারের এ মেয়াদের প্রথম বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ঘোষিত গত বাজেটের (৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা) তুলনায় এটি আকারে অনেক বড়। এ বাজেটের শুল্ককর পরিবর্তনের কারণে বেশ কিছু পণ্যের দামে বড় প্রভাব পড়বে।

যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে :

জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি ও বিলাসবহুল পণ্য পরিহারের উদ্দেশ্যে এ বাজেটে বেশ কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষতিকর নিকোটিন গ্র্যানুলস ও পাউচের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসির তেলচালিত (ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল) গাড়ির ওপর করভার ১৩২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৬ শতাংশ করা হয়েছে, যার ফলে এসব গাড়ির দাম বাড়বে।

স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানিকৃত ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন আমদানিতে নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসেছে। এছাড়া বিদেশি কাজুবাদাম, প্রাকৃতিক মধু, বিদেশি সুপারি, কফি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের শুল্কায়ন মূল্য বাড়ানো হয়েছে। মৎস্য চাষিদের সুরক্ষায় বিদেশি পাঙাশ মাছের ফিলের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। 

যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে :

সাধারণ মানুষের স্বস্তি এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশে এই বাজেটে শুল্কছাড়ের সংখ্যাই বেশি। চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজ, গবাদিপশু ও মাছ-মুরগিসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দ্রব্যমূল্য কমাতে সাহায্য করবে। কৃষকদের সুবিধার্থে সব ধরনের সার ও কীটনাশকের ভ্যাট ও আগাম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। আমদানিকৃত শিশু খাদ্যের কাঁচামালের শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।

চিকিৎসা খাতে বড় ধরনের স্বস্তি দিতে হার্টের রিং (স্টেন্ট) ও চোখের লেন্স সরবরাহের ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যার ফলে হার্টের রিংয়ের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং চোখের লেন্সের দাম ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস ফিল্টার ও ব্লাড টিউবিং সেটের ওপর থেকে ভ্যাট ও আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্যানসারের ওষুধ তৈরির ৯টি নতুন কাঁচামালের আমদানি শুল্ক শূন্য করা হয়েছে।

প্রযুক্তি ও যোগাযোগ খাতে মোবাইল সিমের ওপর থাকা ৩০০ টাকা কর সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশে তৈরি মোবাইল, ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের ভ্যাট অব্যাহতি ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সবচেয়ে বড় সুখবর পেয়েছেন ফ্রিল্যান্সার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও স্টার্টআপ কর্মীরা; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করা এ তরুণদের ভ্যাট থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং স্টার্টআপগুলোর অফিস ভাড়ার ভ্যাট ২০৩৫ সাল পর্যন্ত মওকুফ করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড গাড়ির রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার করায় এগুলোর দাম কমবে। এ ছাড়া স্থানীয় প্রসাধনী শিল্পের কাঁচামালের শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। বিনোদন ও রান্নার সামগ্রীর মধ্যে গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন, সিনেমা ক্যামেরা, প্রজেক্টর, মসলা এবং খেজুরের ওপর থেকে রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হয়েছে।

বাজেট কোনো দুর্ভেদ্য অর্থনৈতিক দলিল বা কেবলই সংখ্যার হিসাব নয়। সরকার আপনার পকেট থেকে কত টাকা কর হিসেবে নিচ্ছে এবং তা দেশের উন্নয়নে, জনসেবায় ও আপনার মৌলিক চাহিদা পূরণে কীভাবে ফেরত দিচ্ছেÑতারই একটি স্পষ্ট রূপরেখা হলো এ জাতীয় বাজেট।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বাজেটে কী আছে   কী নেই   ফরহাদ নাইয়া  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close