বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান কিংবা ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা প্রতিনিয়ত নানা সমীকরণ মেলান। অর্থনৈতিক সূচক বা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের গাণিতিক হিসেবেও এই দেশটির নাম হয়তো অনেক নিচের দিকে। কিন্তু ফুটবলকে ঘিরে উন্মাদনার যে একটি বিশ্বজনীন মানচিত্র রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের নাম খোদাই করা আছে সবার ওপরে। চার বছর পর পর যখন বিশ্বমঞ্চে ফুটবলের বাঁশি বেজে ওঠে, তখন আমাদের এই পলিমাটির বদ্বীপে যে অভূতপূর্ব দৃশ্যপট তৈরি হয়, তা পৃথিবীর আর কোথাও মেলা ভার। ভৌগোলিক সীমানা, রাজনৈতিক মেরুকরণ আর সংস্কৃতির সব কৃত্রিম দেয়াল এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দেয় ফুটবল বিশ্বকাপ।
ফুটবল বিশ্বকাপ আসলে কেবল বাইশজন খেলোয়াড়ের মাঠের লড়াই নয়; এটি মানবসভ্যতার এমন এক মহোৎসব, যা কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দনকে একই ছন্দে মেলাতে পারে। বাঙালির এই ফুটবলপ্রেম কোনো সাময়িক মোহের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি আমাদের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিবর্তনের গল্প। গত চার-পাঁচ দশকে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির ফুটবল দেখার ধরন বদলেছে, কিন্তু ভেতরের সেই আদিম ও অকৃত্রিম আবেগ রয়ে গেছে একদম অপরিবর্তিত।
গত শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবল ছিল মূলত ‘শ্রবণ-নির্ভর’ এক রোমাঞ্চ। তথ্যপ্রযুক্তির আলো তখনো ঘরে ঘরে পৌঁছায়নি। আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে যা প্রায় রূপকথার মতো মনে হতে পারে, সেই সময়ে বিশ্বকাপ ছিল এক শব্দ-তাড়িত জগত। বাজারের চায়ের দোকান কিংবা কোনো প্রবীণের বসার ঘরে একটি মাত্র ট্রানজিস্টার রেডিওকে কেন্দ্র করে জমা হতো উৎসুক মানুষের ভিড়। ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠের প্রতিটি চড়াই-উতরাই নিয়ন্ত্রণ করত শ্রোতাদের নাড়ির স্পন্দন। ধারাভাষ্যকার যখন চড়া গলায় বলতেন, ‘বল নিয়ে বিদ্যুৎগতিতে এগোচ্ছেন মারাদোনা, কাটিয়ে নিলেন দুজনকে...’ তখন রেডিওর সামনে বসা হাজারো মানুষ চোখের পলক না ফেলে কল্পনার ক্যানভাসে এঁকে নিত সেই সবুজ মাঠ আর জাদুকরী ড্রিবলিংয়ের দৃশ্য। শব্দের সেই মায়াজাল মানুষকে এতটাই আবিষ্ট করত যে, মাঠের কঠিন বাস্তবতার চেয়ে কল্পনার সেই জগতটি অনেক বেশি জীবন্ত ও রঙিন হয়ে উঠত। মানুষের কান তখন চোখের কাজ করত।
পরবর্তী সময়ে টেলিভিশনের ‘বোকা বাক্স’ যখন ধীরে ধীরে মানুষের ঘরে প্রবেশ করতে শুরু করল, তখন ফুটবল উপভোগের অভিজ্ঞতায় যুক্ত হলো এক নতুন সামাজিক মাত্রা। প্রথমে ছিল সাদাকালো টেলিভিশনের যুগ। ছোট্ট সেই পর্দায় বিশ্বকাপের খেলা দেখার মধ্যেও ছিল এক অনন্য উত্তেজনা, যা আজকের প্রজন্মের কাছে কল্পনার মতো মনে হতে পারে। পরবর্তীতে রঙিন টেলিভিশনের আগমন ফুটবলপ্রেমীদের সামনে খুলে দেয় এক নতুন দিগন্ত। তবে সে সময় রঙিন টেলিভিশন ছিল অনেক পরিবারের কাছে বিলাসিতার প্রতীক। ফলে পাড়ার একমাত্র রঙিন টিভি সেটটি কোনো ব্যক্তির একক সম্পত্তি হয়ে থাকত না; বরং তা একপ্রকার সামাজিক সম্পদে পরিণত হতো।
বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের রাতে আশপাশের মানুষ ভিড় জমাত সেই টেলিভিশনের সামনে। শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণরাও জায়গা করে নিতেন দর্শকসারিতে। খেলা শুরু হওয়ার আগেই জমে উঠত আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক আর ভবিষ্যদ্বাণীর আসর। আর ম্যাচ চলাকালে প্রিয় দলের একটি গোলেই মুহূর্তের মধ্যে উল্লাসে ফেটে পড়ত পুরো পরিবেশ। করতালি, চিৎকার আর আনন্দধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। কেউ লাফিয়ে উঠত, কেউ একে অপরকে জড়িয়ে ধরত, আবার কেউ আনন্দে পতাকা নাড়াত। ম্যাচ শেষে প্রিয় দলের জয় নিশ্চিত হলে সেই উচ্ছ্বাস আর ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকত না; ছড়িয়ে পড়ত রাস্তাঘাটে, অলিগলিতে এবং জনপদের প্রতিটি কোণে।
গভীর রাত কিংবা ভোররাত- সময় তখন কোনো বাধা ছিল না। বিভিন্ন এলাকায় বের হতো আনন্দ মিছিল। পতাকা হাতে সমর্থকদের স্লোগান, বাঁশির তীক্ষ্ণ শব্দ, ঢাক-ঢোলের তালে তালে উচ্ছ্বাস এবং মোটরসাইকেলের বহরে মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। অন্যদিকে প্রিয় দলের পরাজয়ে নেমে আসত এক ধরনের বিষণ্নতা, যার রেশ টিকে থাকত পরদিনও। চায়ের দোকান, স্কুল-কলেজ, অফিস কিংবা পাড়ার আড্ডায় চলত ম্যাচ বিশ্লেষণ, তর্ক-বিতর্ক এবং হার-জিতের নানা আলোচনা। ফুটবল তখন কেবল একটি খেলা ছিল না; এটি ছিল মানুষের সম্মিলিত আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগির এক অসাধারণ সামাজিক উৎসব। এরপর প্রযুক্তির বিবর্তনের ধারায় এলো প্রজেক্টরের যুগ। বিশাল সাদা কাপড়ের পর্দা টাঙিয়ে পাড়া-মহল্লার মোড়ে মোড়ে খেলা দেখার আয়োজন যেন উৎসবকে আরও বৃহৎ পরিসরে নিয়ে গেল। শত শত মানুষ একসঙ্গে বসে বিশ্বকাপ উপভোগ করত। একটি গোলের সঙ্গে সঙ্গে যে উল্লাসধ্বনি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত, তা যেন কোনো আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের গ্যালারির গর্জনের চেয়ে কম ছিল না।
কালের পরিক্রমায় বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতা আজ ডিজিটাল যুগের এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আগের সেই কাপড়ের পর্দা আর প্রজেক্টরের স্থান দখল করেছে বিশালাকার এলইডি স্ক্রিন। উন্নত পিক্সেল, উচ্চ রেজোলিউশন এবং শক্তিশালী সাউন্ড সিস্টেমের কারণে খেলা দেখার অভিজ্ঞতা এখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জীবন্ত, বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয়। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই এখন বড় পর্দায় বিশ্বকাপ উপভোগের ধুম পড়ে যায়। তবে ফুটবল দেখার মাধ্যম বদলালেও আবেগের মূল উৎসটি একই জায়গায় রয়ে গেছে। এলইডি স্ক্রিনের ঝকঝকে আলোয় যখন মেসির জাদুকরী বাঁ পায়ের শট, রোনালদোর দুর্দমনীয় গোলক্ষুধা, নেইমারের শৈল্পিক পায়ের কারুকাজ কিংবা অন্য কোনো তারকার অবিশ্বাস্য মুহূর্ত ফুটে ওঠে, তখন পুরো এলাকা যেন মুহূর্তেই এক বিশাল ফুটবল গ্যালারিতে পরিণত হয়।
তবে প্রযুক্তির এই জয়যাত্রা আমাদের কেবল মাঠের বড় পর্দাতেই আটকে রাখেনি, বরং তৈরি করেছে এক সুবিশাল ‘ভার্চুয়াল স্টেডিয়াম’। উচ্চগতির ইন্টারনেট আর স্মার্টফোনের কল্যাণে ফুটবল এখন মানুষের হাতের তালুতে। একসময় যে ফুটবলীয় তর্কাতর্কি সীমাবদ্ধ ছিল পাড়ার চায়ের আড্ডায়, তা আজ ফেসবুক, এক্স কিংবা ইনস্টাগ্রামের ওয়ালে বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে।
রেফারি কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত দিলেই সেকেন্ডের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যাচ্ছে চুলচেরা বিশ্লেষণে। ট্রল, মিম ও ছোট ছোট রিলসের মাধ্যমে সমর্থকরা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নতুন রসদ খুঁজে পায়। প্রযুক্তির এই বিপ্লব আমাদের আবেগ প্রকাশের পথকে যেমন প্রশস্ত করেছে, তেমনি সাধারণ দর্শকের ফুটবলীয় জ্ঞানকেও করে তুলেছে অনেক বেশি সমৃদ্ধ।
বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতির সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং কৌতুকপূর্ণ দিক হলো এর দ্বিমেরুপ্রান্তিক সমর্থন। লাতিন আমেরিকার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী- ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা এ দেশের জনমানুষের ফুটবল-মানসকে অলীকভাবেই যেন দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে। বিশ্বকাপ এলেই পুরো বাংলাদেশ এক অন্য রূপ ধারণ করে। আকাশচুম্বী অট্টালিকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জরাজীর্ণ টিনের চাল- সবখানেই উড়তে দেখা যায় মাইলের পর মাইল দীর্ঘ ভিনদেশি পতাকা। নিজ দেশের পতাকার চেয়েও প্রিয় দলের পতাকাকে দীর্ঘতর করার এই যে এক অলিখিত প্রতিযোগিতা, তা সম্ভবত বিশ্ব-সমাজতত্ত্বের এক অনন্য গবেষণার বিষয় হতে পারে। এই উন্মাদনা কখনো কখনো পারিবারিক সম্পর্কের সীমানাও ছাড়িয়ে যায়; যেখানে একই ছাদের নিচে বাস করা বাবা-ছেলে কিংবা স্বামী-স্ত্রী একে অপরের ফুটবলীয় প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। চায়ের কাপে ঝড় ওঠে, কখনো কখনো মৃদু মনোমালিন্যও হয়, তবে সবকিছুর মূলে থাকে এক অদ্ভুত নিষ্কলুষ আনন্দ।
অনেকে ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন তোলেন, ‘নিজেদের দেশ যেখানে মাঠেই নেই, সেখানে অন্য দেশের জন্য এই উথাল-পাথাল আবেগের মানে কী?’ আসলে বাঙালির এই ভিনদেশি প্রীতিকে স্রেফ হুজুগ বা দেশপ্রেমের অভাব ভাবলে ভুল হবে। এটি মূলত এক ধরনের ‘গ্লোবাল সিটিজেনশিপ’ বা বিশ্বনাগরিকত্বের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। ফুটবল বিশ্বকাপ এলে বাঙালি ভৌগোলিক সীমানা ভুলে গিয়ে কেবলই বিশুদ্ধ নন্দনতত্ত্ব আর দক্ষতার পূজারী হয়ে ওঠে। এখানে ফুটবল স্রেফ একটা খেলা নয়, বরং তা হয়ে ওঠে কাঁটাতার পেরিয়ে বিশ্বকে আপন করে নেওয়ার এক পরম সৌহার্দের সেতু।
বাংলাদেশ কোনোদিন বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে খেলবে কি না, তা হয়তো মহাকালের গর্ভেই লুকানো আছে। তবে ফুটবল নামক এই বৈশ্বিক মহাকাব্যের সবচেয়ে একনিষ্ঠ, বিশ্বস্ত ও আবেগী ‘সমর্থক’ হিসেবে বাঙালির নাম ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অম্লান থাকবে। প্রযুক্তির জোয়ারে প্রচারের মাধ্যম বদলালেও রেডিওর তরঙ্গ থেকে স্মার্টফোনের স্ক্রিন পেরিয়ে ভবিষ্যতে হয়তো আরও অভাবনীয় কোনো মাধ্যম আসবে- কিন্তু এই পলিমাটির মানুষের হৃদস্পন্দন আর ফুটবলের সেই চিরচেনা উন্মাদনা কখনোই হারিয়ে যাবে না। ফুটবল ছিল, ফুটবল আছে ও ফুটবল থাকবে এই জনপদের এক নিঃস্বার্থ ও অনন্ত প্রেমের অনন্য উপাখ্যান হয়ে।
কেকে/এমএ