বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে বিউটি টিউটোরিয়ালের ছড়াছড়ির আগের সময়টাতে নির্ভরযোগ্য স্কিনকেয়ার পরামর্শ খুঁজে পাওয়া ছিল বেশ কঠিন। অন্যদিকে, ইন্টারনেটে পাওয়া অধিকাংশ তথ্যই ছিল ইংরেজিতে, যা বেশিরভাগ সময় বাংলাদেশের আবহাওয়া, জীবনযাপন কিংবা ত্বকের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। দেশীয় বাজারও ছিল নানান অনিশ্চয়তায় ভরা। নকল পণ্যের আধিক্য ছিল। এছাড়াও কোন পণ্যটি ত্বকের জন্য উপযুক্ত, সে বিষয়ে গ্রাহকদের জন্য বিশ্বাসযোগ্য কোনো দিকনির্দেশনাও ছিল না।
আর এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই নিঃশব্দে তৈরি হয়েছিল একটি শূন্যস্থান। এই শূন্যস্থান দূর করতেই সাজগোজের সামনে ধরা দিয়েছিল একটি বিশেষ সম্ভাবনা। নিছক পণ্য বিক্রি করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা তৈরির মাধ্যমে গভীর সব সমস্যার সমাধানই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
“ইনোভেশন ফর আ সাস্টেইনেবল ফিউচার: সিলেক্টেড কেসেস (২০২৪)”–এ প্রকাশিত এম. সাঈদ আলম, কোহিনুর বিশ্বাস এবং বুশরা হুমায়রা এশা রচিত একটি কেস স্টাডি অনুযায়ী, ২০১৩ সালে সিনথিয়া শারমিন ইসলাম, নাজমুল শেখ এবং মিল্কি মাহমুদ সাজগোজ নামের এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন। অধিকাংশ স্টার্টআপের মতো শুরু থেকেই আগ্রাসী বিক্রয় কৌশল না নিয়ে তারা বেছে নিয়েছিলেন একেবারেই ভিন্ন পথ, আর তা ছিল ‘কনটেন্ট’।
প্রথমদিকে সাজগোজ বাংলায় সৌন্দর্য আর ত্বকের যত্ন নিয়ে তথ্যভিত্তিক লেখা তৈরি করত। পরে এতে যুক্ত হয় প্রবন্ধ, টিউটোরিয়াল আর প্রোডাক্ট ব্যবহার করার সঠিক পদ্ধতি নিয়ে লেখা, এবং পুরোটাই বাংলাদেশি গ্রাহকদের জন্য তৈরি করা। ধারণাটা সহজ, কিন্তু এর শক্তি ছিল অসাধারণ। কারণ কোনো পণ্য কেনার আগে মানুষের সেটা বোঝা দরকার, আর কোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে বিশ্বাস করার আগে দরকার তার গবেষণা ও তথ্যের ওপর আস্থা।
সাজগোজের এই কৌশল ধীরে ধীরে বদলে দেয় বাংলাদেশের মানুষের বিউটি ও স্কিনকেয়ার বিষয়ে ভাবনা ও সম্পৃক্ততার ধরন। পণ্য বিক্রির ওপর জোর না দিয়ে তারা উত্তর দিতে শুরু করে মানুষের নিত্যদিনের প্রশ্নগুলোর। এই পণ্য কি নিরাপদ? এটি কি আমার ত্বকের জন্য উপযোগী? পণ্যটির সঠিক ব্যবহার কী? এমন সব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে সময়ের সঙ্গে সাজগোজ শুধু একটি ওয়েবসাইট নয়, বরং সচেতন গ্রাহকের জন্য এক নির্ভরযোগ্য পরামর্শদাতায় পরিণত হয়েছে।
সাজগোজের যাত্রা থেকে পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো, প্রকৃত সমস্যা অনেক সময় আমাদের আপাতদৃষ্টির বাইরে থাকে। বিউটি ইন্ডাস্ট্রিতে পণ্যের অভাব কখনোই ছিল না। শুধু অভাব ছিল সঠিক তথ্য ও স্পষ্ট দিকনির্দেশনার। আর এই জায়গাটায় সাজগোজ বুঝতে পেরেছিল, এক্ষেত্রে প্রকৃত ঘাটতি ছিল শেখার এবং সঠিক তথ্যের। আর সেই তথ্য ও স্বচ্ছতা থেকেই জন্ম নেয় বিশ্বাস, যেটাই সবচেয়ে মূল্যবান।
অবশ্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল ভাষা নির্বাচন। ইন্টারনেটের বড় একটি অংশজুড়ে যখন শুধু ইংরেজি কনটেন্টের ছড়াছড়ি, সাজগোজ তখন বাংলা ভাষার ওপর জোর দেয়। স্থানীয়করণের পাশাপাশি তাদের এই পদক্ষেপটি বিশাল পরিসরের গ্রাহকদের একসঙ্গে নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে স্কিনকেয়ার নিয়ে বিভিন্ন জরুরি তথ্য পৌঁছে যায় এমন লাখো মানুষের কাছে, যারা এতদিন বিশ্বজুড়ে সৌন্দর্যচর্চার আওতার বাইরে ছিলেন। ধীরে ধীরে বাংলাদেশের আবহাওয়া, সংস্কৃতি ও মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতাকে তুলে ধরায় তাদের কনটেন্ট হয়ে ওঠে আরও প্রাসঙ্গিক, আরও ব্যক্তিগত।
পাঠকসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে সাজগোজের একটি সক্রিয় কমিউনিটিও। এই প্রতিষ্ঠানটি একসময় এমন একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়, যেখানে মানুষ শুধু কনটেন্ট পড়েই থেমে থাকেনি। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করেছে একে অন্যের সঙ্গে, প্রশ্ন করেছে এবং বিভিন্ন বিষয়ে শিখেছে। এই কমিউনিটিই পরবর্তীতে তাদের প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে এবং সাধারণ পাঠকরা রূপ নেয় সক্রিয় অংশগ্রহণকারীতে।
বর্তমানে সাজগোজকে নিঃসন্দেহে একটি পূর্ণাঙ্গ কনটেন্টনির্ভর ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম বলা চলে। তবে একথাও সত্য যে, বাণিজ্য নয়, বিশ্বাসযোগ্যতাই তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞাপন ও নানা মতামতের ভিড়ে সাজগোজ নিজেকে কেবল আরেকটি বিক্রয়মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং একজন নির্ভরযোগ্য পরামর্শদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উদ্যোক্তারা তাদের এই যাত্রা থেকে খুব সহজ একটি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। আসলে অধিকাংশ ব্যবসাই শুরু হয় এই প্রশ্ন দিয়ে, ‘কীভাবে আরও বেশি বিক্রি করা যায়?’ কিন্তু সাজগোজ শুরু করেছিল অন্যরকম একটি প্রশ্নকে সঙ্গে নিয়ে, ‘কীভাবে মানুষকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করা যায়?’ আর এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই যেন তাদের গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে।
কারণ মানুষ যখন আপনার জ্ঞানের ওপর আস্থা রাখে, তখন একসময় তারা আপনার ব্যবসার ওপরও বিশ্বাস করতে শুরু করে। আর সেই বিশ্বাস যথেষ্ট শক্তিশালী হলে লেনদেনের বিষয়টি খুব স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পেতে থাকে, এর জন্য বাড়তি কিছু করতে হয় না।
সবশেষে বলা যায়, সাজগোজের গল্পটি আসলে শুধু বিউটি পণ্য নিয়ে নয়। এটি আরও বিস্তৃত একটি সত্যের প্রতিফলন। যেকোনো ইন্ডাস্ট্রিতেই শেষপর্যন্ত এগিয়ে থাকে তারা, যারা আগে মানুষকে শেখায়, সহজ ভাষায় কথা বলে, একটি সক্রিয় কমিউনিটি গড়ে তোলে এবং সবকিছুর আগে মানুষের আস্থা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেয়।
কেকে/এলএ