অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের অন্যতম স্কিন ক্যান্সারপ্রবণ দেশ। দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় দুই হাজার মানুষ স্কিন ক্যান্সার ও মেলানোমায় মারা যান। ধারণা করা হয়, প্রতি তিনজন অস্ট্রেলিয়ানের মধ্যে দুজন জীবনের কোনো না কোনো সময় স্কিন ক্যান্সারের চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হন। ফলে সেখানে সানস্ক্রিন শুধু প্রসাধনী নয়, বরং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় একটি স্বাস্থ্যসুরক্ষা পণ্য।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় সানস্ক্রিনের কার্যকারিতা নিয়ে একটি বিতর্ক বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। দেশটির ভোক্তা অধিকারবিষয়ক সংস্থা চয়েস (CHOICE)-এর এক অনুসন্ধানে দাবি করা হয়, পরীক্ষায় ২০টি জনপ্রিয় সানস্ক্রিনের মধ্যে ১৬টি তাদের লেবেলে উল্লেখিত এসপিএফ (SPF) সুরক্ষা দিতে পারেনি। এর মধ্যে একটি এসপিএফ ৫০+ পণ্যের কার্যকারিতা পরীক্ষায় এসপিএফ ৪-এর কাছাকাছি পাওয়া যায় বলে জানানো হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ড ওই ফলাফলের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে, পরে পণ্যটি বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হয়। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার থেরাপিউটিক গুডস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (TGA) বিভিন্ন পরীক্ষাগারের ফলাফলে এত বড় পার্থক্যের কারণ অনুসন্ধান শুরু করে।
এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—শুধু পরিচিত ব্র্যান্ডের নাম বা প্যাকেটের গায়ে লেখা এসপিএফ ৫০ দেখেই কোনো সানস্ক্রিনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায় না। এটি আমদানিকৃত হোক বা দেশীয়—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হলো, পণ্যটি বাস্তবে ঘোষিত সুরক্ষা দিতে সক্ষম কি না।
বাংলাদেশেও সানস্ক্রিন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। তবে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে অনেকেই এটি ব্যবহার করতে অনাগ্রহী। কারও অভিযোগ, সানস্ক্রিন ত্বককে অতিরিক্ত তৈলাক্ত করে, আবার কারও ক্ষেত্রে এটি ত্বকে সাদা আস্তরণ বা ‘হোয়াইট কাস্ট’ তৈরি করে। ফলে কোনো সানস্ক্রিন কার্যকর হতে হলে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই হবে না, সেটি ব্যবহারকারীর জন্য আরামদায়কও হতে হবে।
সানস্ক্রিন কেনার সময় প্রথমেই এসপিএফ (Sun Protection Factor) এবং পিএ (PA) রেটিং সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। এসপিএফ মূলত ইউভিবি (UVB) রশ্মির বিরুদ্ধে সুরক্ষার মাত্রা নির্দেশ করে, যা ত্বক পুড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। অন্যদিকে পিএ রেটিং ইউভিএ (UVA) রশ্মির বিরুদ্ধে সুরক্ষার মান নির্দেশ করে, যা ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে পিগমেন্টেশন, অকাল বার্ধক্য এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই একটি ভালো সানস্ক্রিনে এসপিএফের পাশাপাশি যথাযথ ইউভিএ সুরক্ষাও থাকা প্রয়োজন।
তবে শুধু লেবেলে লেখা তথ্যই যথেষ্ট নয়। ভোক্তাদের জানা উচিত, সানস্ক্রিনের এসপিএফ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণভাবে দুটি পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়—ইন-ভিভো (In vivo) এবং ইন-ভিট্রো (In vitro)। ইন-ভিভো পরীক্ষায় মানব স্বেচ্ছাসেবকদের ত্বকে পণ্য ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ইউভি রশ্মির প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়। অধিকাংশ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ পদ্ধতিকে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে ইন-ভিট্রো পরীক্ষায় পরীক্ষাগারে বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে সানস্ক্রিনের ইউভি প্রতিরোধ ক্ষমতা পরিমাপ করা হয়। এ পদ্ধতি তুলনামূলক দ্রুত ও কম ব্যয়বহুল হলেও দুই ধরনের পরীক্ষার ফল সব সময় এক নাও হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক বিতর্কও সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
এ কারণে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভোক্তাদের এমন ব্র্যান্ডকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, যারা তাদের পরীক্ষার পদ্ধতি, পরীক্ষাগারের নাম এবং পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করে।
বিশ্বজুড়ে সানস্ক্রিনের কার্যকারিতা নিয়ে বাড়তি নজরদারির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠানও তাদের পণ্য তৃতীয় পক্ষের পরীক্ষাগারে যাচাই করাচ্ছে। এতে ভোক্তারা পণ্যের কার্যকারিতা সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে একটি পরীক্ষার ফলকেই চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। পরীক্ষার ধরন, পরীক্ষাগারের মান, পরীক্ষার সময় এবং পদ্ধতি—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সবশেষে বলা যায়, সানস্ক্রিন কেনার ক্ষেত্রে কেবল এসপিএফ ৫০ লেখা আছে কি না, সেটাই একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। পণ্যের পরীক্ষিত কার্যকারিতা, ইউভিএ ও ইউভিবি—উভয় ধরনের সুরক্ষা, পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং নিজের ত্বক ও আবহাওয়ার সঙ্গে উপযোগিতা—এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। সচেতন ভোক্তা হিসেবে প্রশ্ন করা এবং তথ্য যাচাই করাই হতে পারে নিরাপদ সানস্ক্রিন বেছে নেওয়ার প্রথম ধাপ।
কেকে/ এমএস