ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু ঘটনা ছিল নিত্য সংবাদ। এ নিয়ে দেশ-বিদেশে তুমুল সমালোচনা ছিল। মূলত রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে পতিত সরকারের অন্যতম হাতিয়ার ছিল তা। এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড বলেই অবিহিত করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। তবে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তি সময়ে নতুন বাংলাদেশে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না বলেই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক পুলিশি হেফাজতে দুই মৃত্যু নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে মানবাধিকার কর্মীদের।
গত রোববার ফরিদপুরে ডিবি পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু হয় মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ নামের এক ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু হয়। এদিকে গত বুধবার চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে মোহাম্মদ নুরুল আলম নামের এক যুবলীগ নেতার মৃত্যু হয়। উভয় ক্ষেত্রেরই নিহতের পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এনেছে। এদিকে ফরিদপুরের ঘটনায় জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মো. আলমগীর হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক এ দুই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের মানবাধিকার কর্মীরা। এর জন্য অতিউৎসাহীদের দায়ী করছেন তারা। এ বিষয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘ডিবি হেফাজতে ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড। এসব অন্যায়ের ফল ভালো হয় না। নতুন সরকার ধীরে ধীরে ভুল পথেই যাচ্ছে। একটা বিষয় পরিষ্কার মনে রাখা দরকার, পিটিয়ে হত্যা করে রাজনৈতিক মতাদর্শ বিনাশ করা যায় না। অতিউৎসাহীরা সব দলের জন্যই ক্ষতিকর।’
এদিকে ফরিদপুরে পুলিশ হেফাজতে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় সঠিক তদন্ত দাবি করেছেন জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়া। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ফরিদপুর জেলায় একজন আসামির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। পূর্বে তার নামে কোনো মামলা ছিল কি না জানি না।
পুলিশ বলছে, মাদকসহ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু রাতে অসুস্থ হয়ে ছেলেটা মারা যাওয়ার পরে পুলিশ সুপারের বক্তব্য ও শেখ হাসিনা সরকারের পুলিশের বক্তব্য হুবহু মিলে যায়।’
ফ্যাসিবাদী আমলের পুলিশি বয়ান মানুষ ঘৃণার চোখে দেখতো মন্তব্য করে কিবরিয়া বলেন, ‘আশা করি, গণতান্ত্রিক সরকারের পুলিশের বয়ান অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে।’ স্ট্যাটাসের শেষে ঘটনার সঠিক তদন্তের দাবি করে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব বলেন, ‘পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়ে শুধু দায়িত্বশীল কর্মকর্তার প্রত্যাহার বা চাকরিচুত্যিই বড় কথা নয়, মূল কথা হলো, প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে বের করা ও দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া, যাতে আগামী দিনে এ জাতীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে।’
মায়ের সামনেই মারধর : নিহত মির্জা ইশতিয়াক আহমেদের পরিবার এবং পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার বিকেল ৫টার দিকে ডিবি পুলিশ প্রান্তকে তার নিজ বাড়ি মধুখালী পৌর সদরের গোন্দারদিয়া গ্রাম থেকে দুই পুরিয়া গাঁজাসহ আটক করে। সে সময় প্রান্তর মায়ের সামনেই তাকে মারধর করা হয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। পুলিশি নির্যাতনের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে স্বজনরা অভিযোগ করেন।
আটকের পর ওই রাতেই ডিবি হেফাজতে থাকা অবস্থায় প্রান্ত গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে রোববার সকাল ৮টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
এদিকে ডিবি হেফাজতে যুবকের মৃত্যুর এই ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার প্রান্তর জানাজার আগে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এলাকাবাসী। বিক্ষুব্ধ জনতা প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন।
এই প্রতিবাদের পরই মঙ্গলবার দুপুর ১টার মধ্যে গোয়েন্দা পুলিশ শাখার সদর জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মো. আলমগীর হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়।
এছাড়া এই ঘটনায় জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলামকে প্রধান করে এই কমিটি গঠন করা হয়। ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে এই কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও পুলিশি নির্যাতনের কারণে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ নেই বলে শুরুতে দাবি করেছেন পুলিশ সুপার।
কারাগারে মৃত্যু, নির্যাতনের অভিযোগ পরিবারের: চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ নুরুল আলমের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষ। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
নিহত নুরুল আলম চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ইউনিয়নের মাস্টারবাড়ি এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। পরিবার সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার একটি মামলা দেখিয়ে নুরুল আলমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। পরিবারের দাবি, গ্রেপ্তারের সময় তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। কারাগারে যাওয়ার পর কী ঘটেছে তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচারেরও দাবি জানান।
তবে পরিবারের অভিযোগ নাকচ করে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নুরুল আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। থানায় থাকাকালে তার ওপর কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয়নি। আদালতে সোপর্দ করার সময়ও তিনি সুস্থ ছিলেন।
এদিকে কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কারাগারে আনার পর নুরুল আলম অসুস্থতা অনুভব করলে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে গতকাল সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কেকে/ এমএস