কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বাট্টা হাওর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের দুই উপ-পরিদর্শক (এসআই) রেজাউল ইসলাম ও সুবাস চন্দ্র বর্মনের বিরুদ্ধে এক ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
“এলাকা দেখাশোনা করি আমরা, এই এলাকার মালিক হইলাম আমরা। আমরা যদি আপনার বিচার না কইরা দেই ডিআইজি, আইজি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেলে কাজ হইবো?”
ভিডিওতে এসআইকে বলতে শোনা যায়, “এলাকা দেখাশোনা করি আমরা, এই এলাকার মালিক হইলাম আমরা। আমরা যদি আপনার বিচার না কইরা দেই ডিআইজি, আইজি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেলে কাজ হইবো?”
ভুক্তভোগী শারমীন আক্তারের অভিযোগ, গত ৮ জুন সকালে উপজেলার চান্দপুর কুড়েরপাড় এলাকায় পূর্বশত্রুতার জেরে কয়েকজন ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালায়। হামলায় তিনি আহত হন। একই সঙ্গে তার বসতঘরে ভাঙচুর করে প্রায় ১০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি করা হয় এবং তাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি আইনগত ব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চেয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
ভুক্তভোগীর দাবি, অভিযোগের তদন্ত করতে সম্প্রতি এসআই রেজাউল ইসলাম ও এসআই সুবাস চন্দ্র বর্মন তার বাড়িতে যান। সাদা পোশাকে গিয়ে তারা ঘরের ভেতরে বসে তার সঙ্গে এমন আচরণ করেন, যা তিনি অসম্মানজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মনে করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তদন্ত চলাকালে দুই কর্মকর্তা পায়ের ওপর পা তুলে বসে কথা বলেন এবং বিভিন্ন মন্তব্য করেন, যা একজন ভুক্তভোগীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, শারমীন আক্তার বিচার না পাওয়ার অভিযোগ তুলে বলেন, “বিচার না পেলে আমরা ২৪ ঘণ্টা এখানে বসে থাকবো। বিচার পাইনি বলেই আমরা এখানে অবস্থান করছি।”
জবাবে এসআই রেজাউল ইসলাম বলেন, “আপনাদের যেকোনো সমস্যা, আপদ-বিপদ বা প্রয়োজনের কথা আমাদের বলবেন।”
তখন শারমীন আক্তার বলেন, “আপনাদের কাছ থেকে আমরা কোনো সহযোগিতা পাইনি।”
এ সময় এসআই সুবাস চন্দ্র বর্মন জানতে চান, “আপনারা আসলে কী চান?”
জবাবে শারমীন আক্তার বলেন, “এখন এমন একটা সময় এসেছে, মহিলাদের মারধর করলেও বিচার হয় না। আপনারাই দেখিয়ে দিয়েছেন যে এর কোনো বিচার নেই।”
এরপর এসআই রেজাউল ইসলাম প্রশ্ন করেন, “কোনো পুরুষ মানুষ কি একজন মহিলার গায়ে হাত তুলতে পারে?”
ভুক্তভোগী নারী জবাবে বলেন, “ঘর থেকে চুল ধরে টেনে বের করে মারধর করা হয়েছে। এটা কি আইনের বাইরে নয়?”
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রসঙ্গ টেনে এসআই সুবাস চন্দ্র বর্মন ভুক্তভোগী পরিবারকে জিজ্ঞেস করেন, তারা এলাকার নেতাদের মানেন কি না।
ভুক্তভোগী পক্ষ জানায়, তারা কোনো নেতার কাছে যান না।
তখন এসআই সুবাস বলেন, “বিএনপির নেতা কাঞ্চন ভাই তো ফোন দিয়েছেন, তাই না?”
জবাবে ভুক্তভোগী পক্ষ ‘হ্যাঁ’ বললে তিনি বলেন, “তাহলে আপনারা নেতাদের মানেন না কেন?”
পরবর্তীতে তিনি আরও বলেন, “আপনারা কাকে মানেন? দুলাল ভাইকে মানেন? তিনি তো বিএনপির নেতা। এখন ক্ষমতা তো তাদেরই।”
এ সময় ভুক্তভোগী পক্ষ অভিযোগ করে জানায়, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে তারা ওই নেতাদের ঘনিষ্ঠ।
এর জবাবে এসআই সুবাস বলেন, “আপনারা যদি মনে করেন কাঞ্চন ভাইয়ের মাধ্যমে বিচার পাবেন, তাহলে তার সঙ্গে কথা বলুন।”
তবে মামলার বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “মামলার কাগজ আদালতে পাঠানো হয়েছে। এখন আদালতই সিদ্ধান্ত নেবে। আমি তদন্ত করে যা পেয়েছি, সেটাই প্রতিবেদনে লিখেছি। রায় দেওয়ার ক্ষমতা আমার নয়, আদালতের।”
শারমীন আক্তার অভিযোগ করেন, তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের পক্ষ নেওয়া হয়েছে।
জবাবে এসআই সুবাস বলেন, “আপনারা যদি প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হন, তাহলে আদালতে আপত্তি জানাতে পারেন। আমরা আইনের বাইরে কোনো কাজ করি না।”
তিনি আরও বলেন, “বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি আইনের ভিত্তিতেই প্রতিবেদন দিয়েছি।”
এ সময় এসআই রেজাউল ইসলাম বলেন, “হুমকির বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে যুক্ত করতে হলে সাক্ষ্য-প্রমাণ লাগবে। আদালতের অনুমতি পেলে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। এরপর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ করেন, তার অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রতিবেদনে যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
তিনি আরও দাবি করেন, প্রথমে একটি ফিশারির মাছ নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়। পরে তিনি থানায় অভিযোগ করলেও পুলিশ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। বর্তমানে অভিযুক্তরা পুলিশের সঙ্গে চলাফেরা করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
শারমীন আক্তার বলেন, “অথচ আমার বাড়িতেই বারবার তদন্ত করা হচ্ছে। চাইলে আমার বাড়ি তল্লাশি করে দেখুক কোনো অস্ত্র আছে কি না। বিষয়টি থানার ওসিকেও জানিয়েছি, কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাইনি।”
অভিযোগের বিষয়ে এসআই রেজাউল ইসলাম বলেন, “শারমীন আক্তার একটি অভিযোগ করেছিলেন। অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা তার বাড়িতে গিয়ে উভয় পক্ষের কথা শুনি এবং বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করি। তিনি একটি পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করছিলেন। অভিযোগ ছিল, অন্য একজন ওই পুকুরের মাছ দখল করে ভোগ করছিল এবং তাকে মাছ ধরতে বাধা দিচ্ছিল। পরে আমরা অভিযুক্ত পক্ষের সঙ্গে কথা বলে শারমীন আক্তারকে মাছ ধরার সুযোগ করে দিই।”
তিনি আরও বলেন, “এ বিষয়ে পাঁচ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে এবং উভয় পক্ষই সেটি মেনে নিয়েছে। আমাদের দৃষ্টিতে সমস্যাটির সমাধান হয়েছে এবং শারমীন আক্তারের পক্ষ থেকে আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়নি।”
ভিডিওতে তার দেওয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এসআই রেজাউল বলেন, “শারমীন আক্তার আমাদের বিরুদ্ধে কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করেননি। যদি আমাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে অভিযোগ নিয়ে যেখানে যেতে চান সেখানে যাবেন। প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, আইজিপি—যার কাছে যাওয়ার প্রয়োজন সেখানে যান, আমাকে ফেস করেন, সমস্যা নাই।”
অন্যদিকে ভিডিওতে শোনা কথোপকথনের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই সুবাস চন্দ্র বর্মন প্রথমে বলেন, তিনি এমন কোনো কথা বলেননি। পরে ভিডিও রেকর্ডের বিষয়টি জানানো হলে তিনি বলেন, ওই বক্তব্য তার নয়, তার সঙ্গে থাকা এসআই রেজাউল ইসলামের। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, এ ধরনের মন্তব্য করা উচিত হয়নি।
এ বিষয়ে কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার তদন্তের জন্য কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে। পরশুদিনও নতুন একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেটিও তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এসআই রেজাউলের এমন মন্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চাকরিজীবনের শেষ পর্যায়ে এসেও তার আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত ছিল। এসআই সুবাস চন্দ্র বর্মনের বিষয়টিও দেখছি। গত দুই-তিন দিন একটি সরকারি কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকায় তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। ফিরে এসে দুজনের সঙ্গেই কথা বলব।”
এ বিষয়ে কটিয়াদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, “আমি বর্তমানে সরকারি কাজে জেলার বাইরে রয়েছি। ভুক্তভোগীকে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। অভিযোগে সংশ্লিষ্ট দুই এসআইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ উল্লেখ করে ভিডিওটি সিডিতে সংরক্ষণ করে সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
কেকে/ এমএস