তীব্র গরম আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির কারণে দেশজুড়ে টানা লোডশেডিং চলছে। জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কম থাকলেও গ্রামাঞ্চল এবং মফস্বল জেলাগুলোতে দিনে-রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে স্বাভাবিক জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হচ্ছে। অসহ্য গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গরম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়েনি। উল্টো বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি আরও বেড়েছে। এর পুরো চাপ পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা, কোথাও আরও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। ফুটবল বিশ্বকাপ চলায় ফুটবল খেলা দেখতে না পেরে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন অনেকে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। শিশু, বয়স্ক ও রোগীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা দ্রুততার সঙ্গে এই সমস্যার সমাধান আশা করেন।
কুড়িগ্রামে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত :
কুড়িগ্রামে টানা লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৬ থেকে ৭ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ সরবরাহ মিলছে না। তীব্র গরমে জেলার লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দিনের পাশাপাশি গভীর রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। অনেক এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এতে গৃহস্থালি কাজ, শিক্ষা কার্যক্রম, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেকেই রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতি ও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন। ইন্টারনেটনির্ভর কাজ, ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ কখন আসবে আর কখন চলে যাবে, তার নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। ফলে দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় পানির মোটর চালানো সম্ভব না হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে।
তারা আশা করেন, বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। লোডশেডিং কমাবে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করবে। বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে চলমান সংকট দ্রুত নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কুড়িগ্রাম জেলা শাখার এজিএম জানান, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। এর প্রভাব কুড়িগ্রাম জেলার সব উপজেলাতেই পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎ সরবরাহও স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
রাজশাহীতে সাত-আট ঘণ্টা লোডশেডিং :
নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) জিয়াউল ইসলাম বলেন, সরবরাহ অনুযায়ী আমরা বিতরণ করছি। কিন্তু সরবরাহ কম থাকায় কিছু কিছু এলাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। রাজশাহী নগরীর কাদিরগঞ্জ এলাকার ফাতেমা সুলতানা বলেন, তীব্র গরমে শিশু ও বয়স্কদের বেশি দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির সংকটও দেখা দিচ্ছে। রাতে ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না। এতে পরিবারের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। প্রতিদিন সাত-আট ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে। দ্রুত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হওয়া উচিত।
নগরীর বাসিন্দা শিক্ষক সেলিমুজ্জামান বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় নিয়মিত লেখাপড়া করতে পারছে না। তীব্র গরমে শ্রেণিকক্ষেও পাঠদান কঠিন হয়ে পড়ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দুর্ভোগ কমাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি।
রংপুরে এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং :
রংপুরে এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং থাকছে। গ্রামাঞ্চল এবং মফস্বল জেলাগুলোতে বিদ্যুৎ থাকছে না দিনের বেশিরভাগ সময়। ভুক্তভোগীরা বলছেন, একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে লোডশেডিং চলছে। ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। আমরা এ সমস্যার সমাধান চাই। রংপুর নেসকোর বিতরণ বিভাগ-১-এর সহকারী প্রকৌশলী রহমান মোস্তাফিজ বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় বিতরণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এজন্য বেশিরভাগ এলাকায় ঘণ্টা ধরে লোডশেডিং দিতে হয়।
চট্টগ্রামে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে :
চট্টগ্রামে গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে নগরবাসী যেমন দুর্ভোগে পড়েছেন, তেমনি শিল্প-কারখানায়ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নগরের চেয়েও লোডশেডিং বেশি হচ্ছে গ্রামে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা।
নগরের পাঁচলাইশ থানার সংগীত আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মুনতাসির উদ্দিন রাফি বলেন, নগরে প্রতিদিন গড়ে ছয়-সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে। দিনে পাঁচ ঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে। গরমের মধ্যে অসহনীয় লোডশেডিং আমাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এটি দ্রুত নিরসন জরুরি।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকবর হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, আগ্রাবাদ কার্যালয় থেকে চট্টগ্রামসহ তিন পার্বত্য জেলা এবং কক্সবাজারে বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম চলে। উৎপাদন কম থাকায় লোডশেডিং চলছে।
কেকে/এলএ