সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬,
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
শিরোনাম: যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় থামেনি ইসরাইলের হামলা, বাড়ছে হতাহত      জাতীয় সংসদে পাস হলো অর্থবিল-২০২৬      লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার মানুষ পানিবন্ধি      ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু      এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান আহসান হাবিব      ‘যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে’      একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই      
দেশজুড়ে
শ্রীমঙ্গলে ৪ কোটি টাকার সড়ক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
ছবি: প্রতিবেদক

ছবি: প্রতিবেদক

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের কালিঘাট-হোসনাবাদ সড়কে ৪ কোটি ৫ লাখ ২২ হাজার ৮৪৬ টাকা ব্যয়ে চলমান একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে কাজ করার কারণে সড়কটির স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী উন্নতমানের ভিটি বালু, খোয়া ও পাথর ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে কমলগঞ্জের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সানি এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে। 

স্থানীয়দের দাবি, শুরু থেকেই কাজে অনিয়ম করা হচ্ছে। খোয়া ও বালুর পরিবর্তে মাটি ব্যবহার করে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতিতে কাজ সম্পন্ন হলে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হবে এবং কাঙ্খিত সুফল পাওয়া যাবে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এমন দায়সারা ও নিম্নমানের কাজের কারণে স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। 

দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবে অভিযোগগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে না বলেও দাবি করেছেন স্থানীয়রা। তারা প্রকল্পের কাজে কঠোর তদারকি এবং মানসম্মত নির্মাণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে রোববার (২৮ জুন) সকালে সড়কের বাকি অংশ আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ বন্ধ করে দেন। একইসঙ্গে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেন। 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, উপজেলা প্রকৌশল (এলজিইডি) বিভাগের তদারকির অভাব, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও নিয়ম না মেনে কাজ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো কাজ করছে। এতে নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

জানা গেছে, উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের হোসনাবাদ গ্রামসহ ৭টি চা বাগান এলাকার একমাত্র প্রধান সড়ক হোসনাবাদ-বিলাসছড়া সড়ক। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন ভারী ট্রাক, জিপ, সিএনজিসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে। পাশাপাশি ৭টি চা বাগানের শ্রমিকদের প্রধান চলাচলের পথ হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘদিন ধরে ভারী যানবাহনের চাপ ও নিয়মিত সংস্কারের অভাবে সড়কটির বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ তৈরি হয়ে তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে আসে। এরপর সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। 

উপজেলা প্রকৌশল (এলজিইডি) কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, কালিঘাট-মনু-দলই সার্কুলার রোড সংস্কারের জন্য ৪ কোটি ৫ লাখ ২২ হাজার ৮৪৬ টাকার ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে চলতি বছরের ৮  ফেব্রুয়ারি কার্যাদেশ ইস্যু হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২৭ সালের ১৯  ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা প্রকৌশল বিভাগকে (এলজিইডি) ম্যানেজ করে সড়কের গাইডওয়ালে নির্ধারিত গভীরতায় মাটি না খুঁড়ে মাত্র কয়েক ইঞ্চি খনন করা হচ্ছে। প্রথম শ্রেণির ইটের পরিবর্তে নিম্নমানের ও পুরোনো ইট ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া আরসিসি ঢালাইয়ে পরিমাণের চেয়ে কম রড, নিম্নমানের পাথর, ময়লাযুক্ত বালু এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। 

তারা বলেন, রাস্তার আরসিসি ঢালাইয়ে বালু-রাবিশের ওপর যৎসামান্য পাথরের টুকরো (কুচি-গুড়া) ও পুরনো ইটের খোয়া (রাবিশ) ছিটিয়ে চলছে চলছে সড়ক মেরামত। রাস্তার পাশে পুরনো গাইডওয়াল রিপিয়ারিং করে এর ওপরে বসানো হয়েছে ইট-পিলার। ফলে রাস্তা মেরামত চলাকালীন অবস্থায় বিভিন্ন অংশে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া রাস্তার পাশে গাইডওয়ালের ওপর বসানো হয়েছে বালু ও অল্প সিমেন্ট মিশ্রিত বস্তা। এতে বৃষ্টি আসার সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছে বস্তা। যথাযথভাবে রোলার বা ভাইব্রেটর দিয়ে কমপ্যাকশন করার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হচ্ছে না। এতে জনগণের অর্থ অপচয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। 

হোসনাবাদ পানপুঞ্জির মন্ত্রী (পুঞ্জি প্রধান) ওয়েল সুরং বলেন, উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো কাজ করে যাচ্ছে। কাজের শুরু থেকেই ব্যাপক অনিয়ম করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরিমাণ মতো রড, সিমেন্ট, সাদা পাথর, কংক্রিট ও এক নম্বর ইট ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে কাজের গুণগত মান খারাপ হচ্ছে। এতে এর স্থায়িত্ব
কম হবে। 

হোসনাবাদ এলাকাবার বাসিন্দা শাহিন মিয়া বলেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কার যদি পাথরের পরিবর্তে ইটের খোয়া দিয়ে হয় আর এটা দেখার কেউ না থাকে তা হলে এর থেকে দুঃখজনক ঘটনা আর কি হতে পারে?  

এলাকার বিনোদ তাঁতি, সঞ্জয় মুন্ডা অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, রাস্তা সিসি ঢালাইয়ে অনিয়ম হওয়ায় এলাকাবাসীসহ আমরা নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেই। পরে ইউএনও অফিসে লিখিত অভিযোগ জমা দেই।  পথচারী নুরুল ইসলাম বলেন, কোটি টাকার প্রকল্প হলেও কাজে মানের কোনো ছাপ নেই। এভাবে চললে কয়েক মাসের মধ্যেই রাস্তা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়বে।  স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সড়কের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হোক, যাতে জনগণ টেকসই অবকাঠামো সুবিধা পায়।

জানতে চাইলে ঠিকদারের শ্রমিক জাফর আলী বলেন, আমরা ঠিকাদারের কাজ করি। তিনি যেভাবে বলেন আমরা সেভাবে করি। আমাদের ইটের খোয়া দিয়ে ঢালাই দিতে বলেছে। আমরা খোয়া দিয়ে ঢালাই দিয়েছি। কি ধরা ছিল আমরা তা জানি না। আমরা শ্রমিক এতো কিছু আমাদের কি দরকার।

উপজেলা এলজিইডির কার্য সহকারী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, শিডিউল অনুযাযী আমর কাজ করছি। তবে সেলবেজ এর কারণে ইটের মান কিছুটা নিম্নমানের।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সানি এন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী মো. হাসানুজ্জামান বলেন, চুক্তি অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। খারাপ যেটা বলছেন সেটা  সেলবেজ-যেটা সরকার আমাদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। যখন টেন্ডার হয় তখন সেলবেজের ইটগুলো ওরা আমাদেসোথে এড করে দিয়েছিল। আমরা ৭৫ লাখ টাকা দিয়ে সেলবেজের ইট কিনে এগুলে দিয়ে খোয়া বানিয়ে সিসি ঢালাইয়ের কাজে ব্যবহার করছি। কালভার্টের প্যালাসাইটিং ল্যান্ডে আমরা নতুন যেগুলো করছি এগুলো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। পুরনো প্যালাসাইটিং-এ সমস্যা হয়েছিল, পরে বস্তার মধ্যে বালু এবং সিমেন্ট মিশ্রণ করে রাস্তার সাইটে দিয়েছি। মাটি ভরাট করলে ভবিষ্যতে যাতে রাস্তার সাইট না ভাঙ্গে।

উপজেলা এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী সঞ্জয় পন্ডিত বলেন, দুই কিলোমিটার সড়কে ১০ ফুট ৬ ইঞ্চি আরসিসি ঢালাই কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৫ লাখ ২২ হাজার ৮৪৬ টাকা। এর মধ্যে সেলবেজ থেকে ৭৫ লাখ টাকা সরকারের ফান্ডে জমা হবে। মোট খরচ দাঁড়াবে প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, সব যে নিম্নমানের কাজ হচ্ছে তা কিন্তু সত্য নয়। তবে কাজ করলে কিছু উনিশ-বিশ তো একটু হয়ই, কাজে একটু বেশকম হয়েছে, আমি বলবনা যে হান্ডেট পার্সেন্ট ভালো কাজ হচ্ছে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকৌশলী মো. আব্দুর রাকিব বলেন, চলমান রাস্তার কাজ দেখতে আমি মাঝেমধ্যে গিয়েছি, মেইনলি দেখার দায়িতে আমার অফিসের পন্ডিত বাবু। আমি তো ডেইলি যেতে পারব না। আর মালামাল পাঠানোর আগে প্রথমে ল্যাব টেস্ট হয়। যেহেতু বলছেন ন্মিমানের কাজ হচ্ছে তাহলে আমি সরেজমিনে আবার গিয়ে নিন্মমানের সামগ্রী অপসারণ করব।  

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, খোঁজ নিচ্ছি। কাজে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close