মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি প্রণোদনা ও মানবিক সহায়তার তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, বর্গাচাষি ও প্রান্তিক চাষিসহ অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক রয়েছেন বঞ্চিতের কাতারে। তবে ইউরোপ-মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী কয়েকজনের পরিবারের সদস্যসহ বিত্তশালী অনেকের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
স্থানীয়দের দাবি, তালিকায় এমন অনেক নাম আছে, যাদের কৃষিজমি নেই বা বন্যায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। আছে অনেক প্রবাসী পরিবারও। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে সহায়তার লক্ষ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিএনপি নেতা-কর্মীর সহায়তায় তালিকা করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য, বিএনপির ইউনিয়ন-ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের যোগসাজশে তালিকায় হয়েছে স্বজনপ্রীতি। তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারাও সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করেননি।
প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের নাম বাদ পড়ায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
গত ২৩ জুন কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ও ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের কৃষকের মধ্যে চাল ও নগদ টাকা বিতরণ করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্রাহ্মণবাজারের দাউদপুর গ্রামের মতিন মিয়া নামে এক ব্যক্তি সহায়তা পেয়েছেন। যার দুই ছেলে ইউরোপ থাকেন। আরেক ছেলে সরকারি চাকরি করেন। নাছনী গ্রামের দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী জলিল মিয়া ও তার ভাই খালিকও পেয়েছেন সহায়তা। সাতরা গ্রামের নাদির মিয়ার নাম আছে তালিকায়। তার এক ছেলে কানাডা ও অন্য ছেলে আরেক দেশে থাকেন।
একজন প্রধান শিক্ষক ও জামাল মিয়া নামে ব্যক্তি বোরো মৌসুমে কোনো আবাদ না করেও সহায়তা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বরমচাল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে খালেদ নামে ব্যক্তির বোরো ধানের জমি না থাকলেও তিনি সহায়তা পেয়েছেন। ওই ওয়ার্ডের সাবেক ওয়ার্ড সদস্য মহরম আলীও পেয়েছেন একই রকম সহায়তা। ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহিন আহমদ নাছির ও তার ভাই সেলিম আহমদের পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকলেও এ দুইজনও আছেন ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায়।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করে তাদের প্রাপ্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা আরও দুর্ভোগের মুখে পড়বেন।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছয়ফুল আলম বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নের কৃষকদের তালিকা তৈরিতে অনেক অনিয়ম হয়েছে। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে অনেক প্রবাসী ও বিত্তবান পরিবারের সদস্যদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে।’
ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়াসহ সংশ্লিষ্টদের কারণে অনেক প্রকৃত দরিদ্র কৃষক বঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য এমপিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।
অভিযোগের বিষয়ে ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়া বলেন, ‘চেয়ারম্যান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাসহ যাচাই-বাছাই কমিটি ৫১৮ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু বরাদ্দ এসেছে মাত্র ১৯০ জনের জন্য। তাড়াহুড়ো করে তালিকা প্রস্তুত করতে গিয়ে কিছু ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে। বঞ্চিতরা অভিযোগ করতেই পারেন।’
কুলাউড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্র জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কুলাউড়ায় প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাওড়াঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে পুনর্বাসন ও সহায়তার লক্ষ্যে মে ও জুনের জন্য পরিবারপ্রতি ১৫ কেজি চাল ও নগদ ৩ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। ক্ষতিগ্রস্তকৃষকের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদে উৎসাহিত করাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য।
এ কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ১ হাজার ৫৩৭ জন কৃষকের জন্য ৪৬ দশমিক ১ মেট্রিক টন চাল এবং ৯২ লাখ ২২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বরমচাল ইউনিয়নে ১৪৫, ভূকশিমইলে ৪৩৭, ভাটেরা ১৫০, জয়চন্ডী ৯০, ব্রাহ্মণবাজার ১৯০, কাদিপুর ১৯৫, কুলাউড়া সদর ৪০, রাউৎগাঁও ৬০, টিলাগাঁও ৩৫, হাজীপুর ৬৫, পৃথিমপাশা ৩০ ও কুলাউড়া পৌরসভায় ১০০টি পরিবারের মধ্যে সহায়তা বিতরণ করা হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘চলতি বছর বন্যায় অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের পুনর্বাসনে তালিকা প্রস্তুত করা হয়। বরাদ্দ কম পাওয়ায় কিছু প্রকৃত কৃষক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন এটা সত্য। অনিয়মের বিষয়ে ইউএনও বরাবর অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা আক্তার বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম পাওয়া গেছে। যাচাই-বাছাই কমিটির স্বাক্ষরিত তালিকা পাওয়ার পর ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটির লোকদের উপস্থিতিতে সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ দেখেছি। কৃষি অফিসার ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও তালিকাভুক্ত হয়ে থাকলে অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঠোর বার্তা দিয়েছেন মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু।
তিনি তার ফেসবুক পেজে লিখেন, ‘কুলাউড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা বিতরণে নানা অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না’।
কেকে/এমএ