দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় গত দুই মাস ধরে টানা তীব্র লোডশেডিং চলছে। এতে বিপাকে পড়েছেন ওইসব এলাকার বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, হাসপাতাল ও বাড়িতে থাকা রোগীরা দুর্ভোগে পড়েছেন। আবার ২ জুলাই থেকে যাদের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে, তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। তারা ঠিকমতো পড়ালেখা করতে পারছেন না। এতে পরীক্ষা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিন ধরে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও, ভাঙচুর ও মানববন্ধন হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবারও অনেক জেলায় বিক্ষোভ হয়েছে। সবার অভিযোগ একটাই—দিন-রাত মিলিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎ যায় না আসে, সেটাই বুঝতে পারেন না এলাকাবাসী। চাহিদামতো মিলছে না বিদ্যুৎ। এতে সবাই চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছেন।
জানা গেছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা (গ্রিডভিত্তিক) ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। তবে উৎপাদন অনেক কম। জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয়, কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ ও আমদানিনির্ভর বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে একটি বা দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলেই জাতীয় গ্রিডে তৈরি হচ্ছে বড় ঘাটতি। বাড়ছে লোডশেডিং। জাতীয় সংসদেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেড়েছে। কোথাও কোথাও আবার ভোল্টেজের সমস্যাও প্রকট। রাজধানী ঢাকায় তুলনামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও জেলা ও গ্রামাঞ্চলের চিত্র ভিন্ন। গ্রামে প্রতিদিন কয়েক দফা লোডশেডিং হয়। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বাড়ছে ক্ষোভ। গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, প্রচণ্ড গরমে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক গৃহস্থালির কাজ। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষিকাজ ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রংপুরের বাসিন্দা সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, দিন-রাতে প্রায়ই বিদ্যুৎ চলে যায়। গরমে লোডশেডিং আছেই। ঘুমের মধ্যে দেখি বিদ্যুৎ চলে গেছে, আর ঘুম হয় না। বাচ্চা ও বৃদ্ধরা বেশি কষ্ট পাচ্ছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভকারীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও অসহনীয় লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কার্যকর কোনো সমাধান না পাওয়ায় মহাসড়ক অবরোধ করতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
এদিকে বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে উৎপাদন সক্ষমতা অনেক হলেও সব কেন্দ্র একসঙ্গে চালানোর মতো পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানি সব সময় পাওয়া যায় না। এ ছাড়া উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণেও অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না। ফলে কাগজে-কলমে সক্ষমতা বেশি থাকলেও বাস্তব উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কম থেকে যাচ্ছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদা বাড়ার সময় উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হলে লোডশেডিংয়ের আশ্রয় নিতে হয়। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দেশীয় জ্বালানি উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বাস্তবে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া কঠিন।
কেকে/এলএ