একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো আইনের শাসন এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা আমাদের এই মৌলিক বিশ্বাসের ভিতকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও জেল হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা এবং তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হওয়া তিনটি লাশ নাগরিক সমাজকে এক গভীর উদ্বেগের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ক্ষমতার পালাবদল বা রাজনৈতিক পটভূমির পরিবর্তন যাই হোক না কেন, রাষ্ট্রের হেফাজতে বা রাষ্ট্রের বাহিনীর উপস্থিতিতে কোনো নাগরিকের অস্বাভাবিক মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চিরাচরিত মনোভাব এবং গদবাঁধা বক্তব্য জনমনে তাদের প্রতি আস্থা বাড়ানোর বদলে কেবলই অনাস্থার দেয়ালকে আরও দৃঢ় করছে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে যুবলীগ নেতা নুরুল আলমের মৃত্যুর ঘটনাটি দিয়ে যদি শুরু করা যায়, তবে দেখা যাবে ২৪ জুন গ্রেপ্তারের পরদিনই তিনি কারা হেফাজতে থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারের সময় তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। প্রশ্ন হলো, সুস্থ একজন মানুষ মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কীভাবে কারাগারে মারা গেলেন? একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে পটুয়াখালী জেলা কারাগারেও। সেখানে বন্দি অবস্থায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শফিকুল ইসলাম খানের মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে, ফরিদপুরে আইন কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদের ডিবি পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই দাবি করা হয়েছিল যে, মাদকের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং তিনি অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং স্বজনদের বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, গ্রেপ্তারের সময় তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল।
হেফাজতে মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্তই সারা দেশে কারা হেফাজতে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৩৩ জনই ছিলেন বিচারাধীন বন্দি বা হাজতি। এই পরিসংখ্যান একটি ভয়ানক চিত্রের দিকে ইঙ্গিত করে। বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আগেই যদি রাষ্ট্রের হেফাজতে নাগরিকদের প্রাণ চলে যায়, তবে দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও মানবাধিকারের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
এরই মধ্যে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে তুরাগ নদ থেকে মাত্র দুদিনের ব্যবধানে তিনটি লাশ উদ্ধারের ঘটনা। ২৬ জুন সুমনের অর্ধগলিত লাশ এবং তার আগে ২৪ জুন আরিফ হাসান ও রনি মোল্লা নামের দুই যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দাবি, এই যুবকরা তাদের কর্মী ছিলেন এবং দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন। তবে রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে এখানে সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে মানুষের জীবনের মূল্য এবং পুলিশের দ্বিমুখী ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক বিবৃতিতে দাবি করেছে যে, তুরাগ থানা এলাকায় এ ধরনের ধারাবাহিক লাশ উদ্ধার বা হত্যাকাণ্ডের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি এবং কোনো অভিযোগ বা জিডিও হয়নি। অথচ গণমাধ্যমের সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, পুলিশের একাধিক ইউনিট এই ঘটনার তদন্ত করছে এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল ঘটনার সত্যতাও পেয়েছে।
ডিবির তদন্ত অনুযায়ী, গত ২২ জুন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একদল নেতাকর্মী তাদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে মিছিলে যোগ দিতে নৌকাযোগে যাওয়ার সময় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও পুলিশের ধাওয়ার মুখে পড়েন। আতঙ্কে তারা নদীতে ঝাঁপ দেন এবং তীব্র স্রোতে সুমন ও আরিফুল ইসলাম রাকিব তলিয়ে যান। পুলিশ সেখান থেকে সাতজনকে আটকও করে।
এখানেই সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের মনে বিশাল কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ডিএমপির কেন্দ্রীয় বিবৃতির সঙ্গে ডিবির মাঠ পর্যায়ের তদন্তের এই চরম বৈপরীত্য কেন? কেন একটি সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলো? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যারা জীবন বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দিলেন, তাদের উদ্ধারে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কী ভূমিকা পালন করেছিল? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব কি কেবল কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে চলে আসা, নাকি বিপদে পড়া নাগরিকদের জীবন রক্ষা করা? যখন পরিবারগুলো তাদের সন্তানের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছিল, তখন পুলিশের ভূমিকা কেন এত নিষ্ক্রিয় এবং উদাসীন ছিল?
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সন্তানহারা পরিবারগুলো এখন এক চরম ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তারা ভয়ে কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছে না। রাজনীতি করার অপরাধে বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সন্তানকে হারানোর পর এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও তারা শঙ্কিত। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে স্বজনহারা পরিবারের এই স্তব্ধতা ও ভয় কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
আদর্শ ও নীতির লড়াইয়ে নিজের শত্রুর জন্যও সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন এই মহান ও উদার নীতিতে বিশ্বাস করতেন শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি। আজ তার সেই অমোঘ বাণীকে স্মরণ করা বড্ড বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা শত্রুতা কখনো মৌলিক মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের পথে বাধা হতে পারে না।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হতে পারে, দলটির নামে মিছিল করা দেশের আইন অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেই দলের সঙ্গে জড়িত বা সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে কোনো নাগরিককে আইনের তোয়াক্কা না করে বেঘোরে মরতে হবে। অপরাধের বিচার আদালতে হবে, প্রচলিত আইনে হবে। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাবে বা পুলিশের ধাওয়ায় নদীতে ডুবে মরতে হওয়া কিংবা হেফাজতে পিটুনি খেয়ে মারা যাওয়া কোনো আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে না।
আমাদের দেশের একটি দীর্ঘ ও দুর্ভাগ্যজনক ঐতিহ্য হলো, প্রতিটি সরকারের আমলেই পুলিশ প্রশাসনকে এক ধরনের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সঙ্গে পুলিশের সুর বদলে যায়, কিন্তু তাদের দমনমূলক মনোভাব ও মুখস্থ সাফাই গাওয়ার প্রবণতা একই থাকে। কোনো ঘটনা ঘটলেই ‘অসুস্থতা’, ‘মাদক’ কিংবা ‘অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু’র গল্প সাজানো পুলিশের একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তারা হয়তো ধরে নিয়েছে যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি নির্দিষ্ট পক্ষের মানুষের মৃত্যু নিয়ে কেউ কথা বলবে না বা প্রতিবাদ করবে না। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল এবং আত্মঘাতী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই পক্ষপাতদুষ্ট ও অপেশাদার আচরণের কারণে সাধারণ মানুষের মনে পুলিশ প্রশাসনের ওপর আস্থা আজ তলানিতে এসে ঠেকেছে।
নাগরিক সমাজ আজ তীব্রভাবে অনুভব করছে যে, পুলিশ এখনো অসহায় ও বিপন্ন মানুষের আশ্রয়স্থল হতে পারেনি, বরং তারা পূর্বের মতোই ক্ষমতাসীনদের বা রাজনৈতিক স্বার্থের দাস হিসেবে কাজ করছে। একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক ও মানবিক হয়ে ওঠে, যখন সেখানে প্রতিটি নাগরিকের, তা সে অপরাধী বা ভিন্নমতাবলম্বী যাই হোক না কেন, জীবনের আইনি ও মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে বা কারা হেফাজতে মৃত্যু এবং তুরাগ নদের এই ট্র্যাজেডি নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তার একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন।
পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি পেশাদার ও মানবিক বাহিনী হিসেবে গড়ে না তুললে, চব্বিশের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে যেই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন সাধারণ মানুষ দেখেছেন সেই স্বপ্ন পুরোপুরি ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে। আজ যারা অন্যের বিপদে নীরব থাকছেন, আগামীকাল হয়তো তাদেরও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। যার জলন্ত প্রমাণ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার সরকারের পতন ও দেশ ছেড়ে পলায়ন সেই সঙ্গে বর্তমান এসব ঘটনা।
আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকে তার এই উদাসীনতা ও পক্ষপাতিত্ব থেকে অনতিবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ ও চব্বিশের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে জন্ম নেওয়া নতুন বাংলাদেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে একজন সচেতন নাগরিকের এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক
কেকে/ এমএস