বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘পূর্ণিমা তিথির সাধুমেলা’ ও সাত দিনব্যাপী ‘লালন দর্শন ও লালন সংগীত বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা’র আয়োজন-পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে সাধু-গুরু, ভক্ত-অনুরাগী ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিনের কাছে প্রতিবাদলিপি দিয়েছেন তারা।
স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, ফকির লালন শাহকে নদীয়ার ফকিরি ধারা ও গুরু-শিষ্য পরম্পরা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি বাজারি ‘বাউল ব্র্যান্ড’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
আয়োজকদের অভিযোগ, ‘সাধুমেলা’ নামের অনুষ্ঠানে প্রকৃত সাধু-গুরু, নদীয়ার পাঁচ ঘরের অনুসারী কিংবা আখড়াবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নেই, যা তাদের ভাষায় লালনসাধনাকে তার মূল ঘর থেকে সরিয়ে মঞ্চনির্ভর প্রদর্শনীতে পরিণত করার শামিল।
প্রশিক্ষণ কর্মশালার প্রশিক্ষক নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিবাদকারীরা। তাদের দাবি, নির্বাচিত কয়েকজন প্রশিক্ষকের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ায় লালনের গান ও গায়কী বিকৃত করার অভিযোগ রয়েছে এবং তারা লালনের ধামসংলগ্ন এলাকায় ভক্ত-অনুরাগীদের আপত্তির মুখে পড়েছেন।
এমন বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষক হিসেবে রাখা বিকৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল বলে মনে করছেন তারা।
স্মারকলিপিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কর্মশালার প্রচার-পোস্টারে ব্যবহৃত ছবির বিষয়টি।
প্রতিবাদকারীদের ভাষ্য, পোস্টারে গেরুয়া রঙের পোশাকে সাধুদের উপস্থাপন করা হয়েছে, অথচ লালন ধারার সাধুরা ঐতিহ্যগতভাবে এই রঙ পরেন না।
তাদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় গেরুয়া রঙ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ওঠায় এই ধরনের উপস্থাপনা লালন ধারাকে একটি ভুল ও সাম্প্রদায়িক চিহ্নব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা মাজার-আখড়াবিরোধী শক্তিকে উৎসাহিত করতে পারে।
সাবেক মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর আমলে শিল্পকলা একাডেমি ঘিরে ওঠা দুর্নীতি, দলীয়করণ ও সাংস্কৃতিক দখলদারির অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিবাদকারীরা বলেন, ‘লালনের নামে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলোতে পুরনো সুবিধাভোগীদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
তাদের আট দাবির মধ্যে রয়েছে—সাধুমেলায় প্রকৃত সাধু-গুরু ও নদীয়ার ঘরের অনুসারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; প্রশিক্ষক নির্বাচনের মানদণ্ড প্রকাশ করা ও বিতর্কিতদের বাদ দেওয়া; লালন বিষয়ক জাতীয় কার্যক্রমের দায়িত্ব লালন একাডেমিকে দেওয়া; আখড়া-ধামভিত্তিক কার্যক্রমে সরাসরি রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা; প্রচারসামগ্রীতে বিভ্রান্তিকর প্রতীক ব্যবহার বন্ধ করা এবং লিয়াকত আলী লাকীর আমলের অনিয়ম নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
প্রতিবাদকারীরা মনে করেন, লালন ফকিরকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা মানে বাংলার ভাবধারাকেই বিকৃত করা এবং সাধু-গুরুদের বাদ দিয়ে তার নামে অনুষ্ঠান করা সাধনাকে অপমান করার শামিল।
তারা দ্রুত শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের কাছে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
কেকে/এমএ