ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও জনপ্রিয় নায়কদের একজন সালমান শাহ। মাত্র কয়েক বছরের চলচ্চিত্রজীবনেই তিনি দর্শকের হৃদয়ে এমন জায়গা করে নিয়েছিলেন, যা আজও অমলিন। অভিনয়, সংলাপ বলার ধরন, পোশাক-পরিচ্ছদ ও নিজস্ব স্টাইল—সব মিলিয়ে নব্বইয়ের দশকের তরুণদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য ফ্যাশন আইকন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে তার মৃত্যু বাংলা চলচ্চিত্রে তৈরি করে এক অপূরণীয় শূন্যতা। মৃত্যুর এত বছর পরও তাকে ঘিরে দর্শকের আগ্রহ, আবেগ ও ভালোবাসা কমেনি।
চলচ্চিত্রে অভিষেক
সালমান শাহর প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। টেলিভিশনে অভিনয়ের মাধ্যমে তার শিল্পীজীবনের শুরু। এরপর বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ। বিপরীতে ছিলেন মৌসুমী।
সালমান শাহ। ফাইল ছবি
ছবিটি মুক্তির পরই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান সালমান শাহ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। মাত্র কয়েক বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে তিনি অভিনয় করেন ২৭টি সিনেমায়। তার অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে ছিল ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্নেহ’, ‘প্রেম যুদ্ধ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘আশা ভালোবাসা’, ‘তোমাকে চাই’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’সহ একাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র।
অভিনয়ের পাশাপাশি স্টাইলেও ছিলেন অনন্য
সালমান শাহ শুধু অভিনয়ের জন্যই জনপ্রিয় ছিলেন না। তার পোশাক, চুলের স্টাইল, গগলস, জ্যাকেট, টুপি, স্কার্ফ কিংবা জিন্স—প্রতিটি বিষয়ই তরুণদের মধ্যে নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড তৈরি করেছিল।
তার অভিনয়ে ছিল চরিত্র অনুযায়ী বৈচিত্র্য। কখনও প্রেমিক তরুণ, কখনও প্রতিবাদী যুবক, কখনও ছাত্রনেতা, আবার কখনও গ্রামীণ পরিবেশের সাধারণ মানুষের চরিত্রে দেখা গেছে তাকে। পর্দায় স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় এবং সংলাপ উপস্থাপনের নিজস্ব ধরন তাকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
সালমান শাহ ও শাবনূরের জুটি
সালমান শাহ ও শাবনূরের জুটিও দর্শকের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। পাশাপাশি মৌসুমীসহ সে সময়ের একাধিক নায়িকার সঙ্গে অভিনয় করে সফল জুটি উপহার দেন তিনি।
মাত্র চার বছরে ২৭ সিনেমা
১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত চলচ্চিত্রে সক্রিয় ছিলেন সালমান শাহ। এই সময়ের মধ্যে তার অভিনীত ২৭টি চলচ্চিত্র দর্শকের সামনে আসে। মৃত্যুর পরও তার অভিনীত কয়েকটি অসমাপ্ত সিনেমা মুক্তি পায়, ফলে দর্শকের কাছে তার উপস্থিতি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকে।
তার বেশির ভাগ ছবিই বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ায় অল্প সময়েই তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম শীর্ষ তারকায় পরিণত হন। তার সিনেমার গানও ছিল দর্শকের কাছে সমান জনপ্রিয়। এখনো বিভিন্ন আয়োজনে তার অভিনীত সিনেমার গান পরিবেশন করতে দেখা যায় নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের।
মৃত্যু
জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অবস্থায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আসে সেই দুঃসংবাদ। সালমান শাহ আর নেই—খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্তব্ধ হয়ে যায় চলচ্চিত্র অঙ্গন ও তার অসংখ্য ভক্ত।
তার মৃত্যুর পর থেকেই মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তার পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আপত্তি জানানো হয় এবং মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে একাধিক পর্যায়ে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলে।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা দাবি সামনে এলেও এসব দাবির সবগুলো প্রমাণিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। ফলে সালমান শাহর মৃত্যু আজও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত রহস্য হিসেবে মানুষের আগ্রহের বিষয় হয়ে আছে।
ভক্তদের ভালোবাসায় আজও অমর
সালমান শাহর মৃত্যুর পরও তার জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি পরিচিত হয়েছেন একজন কিংবদন্তি অভিনেতা হিসেবে। তার সিনেমা, অভিনয় ও ফ্যাশন নিয়ে এখনো আলোচনা হয়।
সালমান শাহর ফ্যাশন। ফাইল ছবি
মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্রজীবন একজন অভিনেতাকে কতটা জনপ্রিয় করে তুলতে পারে, সালমান শাহ তার অন্যতম উদাহরণ। ২৭টি চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ারসংখ্যা হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু তার প্রভাব ছিল অনেক দীর্ঘস্থায়ী।
বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের কাছে সালমান শাহ শুধু একজন প্রয়াত নায়ক নন; তিনি নব্বইয়ের দশকের এক প্রজন্মের আবেগ, ভালোবাসা ও স্মৃতির অংশ। পর্দা থেকে বিদায় নেওয়ার তিন দশক পরও তার নাম উচ্চারিত হয় ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায়।
সময়ের স্রোতে অনেক তারকা হারিয়ে যান, কিন্তু কিছু নাম থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে। সালমান শাহ তেমনই এক নাম—ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক অকালপ্রয়াত নক্ষত্র।