গ্রামীণফোনের ১৬ বছরের আইনগত পাওনা পরিশোধে গড়িমসি, শান্তিপূর্ণ শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশি বাধা, গভীর রাতে গ্রেপ্তার ও মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ১১টায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির জাতীয় প্রেস ক্লাবে সামনে গ্রামীণফোন ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ‘গ্রামীণফোনের হাজারো সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী গত ১৬ বছর ধরে তাদের আইনগত ৫ শতাংশ বিলম্বজনিত পাওনা থেকে বঞ্চিত। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার মোবাইল ফোন অপারেটরদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল আন্ডারটেকিং হিসেবে ঘোষণা করার পর শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মচারীরা ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) ও ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার ফান্ডের (ডব্লিউডব্লিউএফ) আওতায় ৫ শতাংশ মুনাফাভিত্তিক প্রাপ্য লাভের অধিকার অর্জন করেন।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, গ্রামীণফোন সরকারি গেজেটকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট দায়ের করে বছরের পর বছর কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা আটকে রাখে। পরে ২০২৩ সালের ৬ মার্চ প্রতিষ্ঠানটি নিজেই সেই রিট প্রত্যাহার করে নিলেও দীর্ঘদিন অর্থ আটকে রাখার ফলে শ্রম আইন অনুযায়ী সৃষ্ট বিলম্বজনিত পাওনা আজও পরিশোধ করেনি।
মানববন্ধনে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী বর্তমানে এই বিলম্বজনিত প্রত্যেকের পাওনার পরিমাণ প্রায় ৩৩ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা; যা প্রায় চার হাজার সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের ন্যায্য আইনগত অধিকার।
বক্তারা আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে সাবেক কর্মীরা ঢাকার জিপি হাউসের সামনে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক কর্মসূচি পালন করে আসছেন। গত ১৮ মাসে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, দোয়া মাহফিল, বৃক্ষরোপণ, গণপাঠ, কবিতা আবৃত্তি, প্রতিবাদী গান এবং কাফনের কাপড় পরে প্রতীকী প্রতিবাদসহ বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করা হলেও গ্রামীণফোন আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর সংলাপে বসেনি।’
মানববন্ধনে ৩০ জুনের ঘটনাকে শ্রমিক আন্দোলনের ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বক্তারা বলেন, ‘পূর্বঘোষিত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বানচাল করার লক্ষ্যে ২৭ জুন দিবাগত রাত প্রায় ২টায় সাবেক কর্মী প্রিন্সকে তার বাসা থেকে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ৩০ জুন সকাল সাড়ে ৯টায় গ্রামীণফোনের প্রধান কার্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে আরও ছয়জন সাবেক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয় এবং শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হয়নি।’
বক্তারা বলেন, ‘ন্যায্য পাওনা দাবি করা ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। ভয়ভীতি, মিথ্যা মামলা ও পুলিশি গ্রেপ্তারের মাধ্যমে শ্রমিকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
মানববন্ধন থেকে সরকারের প্রতি আরও জোরালো আহ্বান জানানো হয়, গ্রামীণফোন যেন দেশের শ্রমিকদের ন্যায্য আইনগত পাওনা পরিশোধ না করে বিদেশে মুনাফা স্থানান্তর করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
বক্তারা বলেন, ‘গ্রামীণফোনের উল্লেখযোগ্য শেয়ার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মালিকানাধীন। তাই বাংলাদেশের শ্রমিকদের আইনগত পাওনা নিষ্পত্তির বিষয়টি নিশ্চিত না করে মুনাফা বিদেশে স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।’
বক্তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, গ্রামীণফোনকে আরও জনবান্ধব ও গ্রাহকবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য।
তারা বলেন, দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থে কলরেট ও ডাটা প্যাকেজের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা, ডাটার মেয়াদ বৃদ্ধি, সেবার মান উন্নয়ন এবং গ্রাহকসেবাকে আরও জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করা সময়ের দাবি।
বক্তারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের গ্রাহকদের কাছ থেকেই প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করে; তাই সেই মুনাফার সুফল দেশের গ্রাহক, শ্রমিক ও সামগ্রিক অর্থনীতির কল্যাণে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
মানববন্ধন থেকে সরকারের প্রতি দাবি জানানো হয়—গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইনগত ৫ শতাংশ বিলম্বজনিত পাওনা দ্রুত পরিশোধ নিশ্চিত করা; শান্তিপূর্ণ শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা; শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিষ্পত্তির আগে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি অনুযায়ী কোম্পানির আর্থিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা; গ্রামীণফোনকে আরও গ্রাহকবান্ধব, শ্রমিকবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
কেকে/এমএ