মাওয়া উপজেলার সোনাতুন্দি গ্রামের হাট দারিয়াপুর স্কুলের করিম মাস্টারকে কখনো ঢাকায় আসতে হয়নি। বহু বছর ধরে হাঁপানির সমস্যা আছে তার, শীত এলে যা বেশ কষ্ট দেয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকের পরামর্শেই এতদিন সুস্থ ছিলেন, নিজের যাবতীয় কাজকর্ম করে বেড়িয়েছেন। কিন্তু কিছুদিন ধরে শ্বাসকষ্টের সঙ্গে যোগ হয়েছে বুকে ব্যথা।
দীর্ঘদিনের চেনা ও ভরসার চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে তিনি এক শ্যালককে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাসায় এসেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে।
কিন্তু অচেনা এ শহরে কোন চিকিৎসককে দেখাবেন, কীভাবে যাবেন, কখন ও কীভাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে—এসব প্রশ্নই হয়ে উঠল বিশাল এক ঝক্কি। সব বাধা পেরিয়ে যথাস্থানে পৌঁছালে অভিজ্ঞ চিকিৎসক করিম মাস্টারের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, রোগের বিবরণ জেনে কিছু ওষুধ লিখে দিলেন এবং কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে সাত দিন পর আবার দেখা করতে বললেন।
প্রকৃতির কোলে নিরুপদ্রবে বেড়ে ওঠা করিম মাস্টার আরও সাত দিন ঢাকায় থাকতে হবে শুনে সংকুচিত হয়ে পড়লেন। অচেনা শহরে যাতায়াতের ঝক্কি আর থাকা-খাওয়ার বাড়তি খরচ—দুটোই তাঁর কাছে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াল।
একটি একার গল্প নয়
প্রতিদিন করিম মাস্টারের মতো অসংখ্য মানুষ এমন নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে সেবা নিতে যাচ্ছেন। প্রশ্ন হলো, গ্রাম ও মফস্বল শহরে বসবাসকারী আমাদের ভাই-বোনদের এই হয়রানি থেকে কি মুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়? তাঁরা নিজেদের চেনা পরিবেশে থেকেই কি দেশের বড় বড় চিকিৎসাকেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ সেবা পেতে পারেন না?
আমাদের দেশে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বড় বড় শহরের হাসপাতালে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ দেশের ৭০ ভাগ মানুষ বাস করেন গ্রাম ও উপজেলায়, যারা এ অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা থেকে মূলত বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন।
নদীমাতৃক আমাদের এ দেশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার যতটা উন্নতি হয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশি উন্নতি হয়েছে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার। এ টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই একদল অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রযুক্তিবিদের মেধা ও আন্তরিকতা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে পারে।
জাতীয় পরিচয়পত্রই হতে পারে স্বাস্থ্যকার্ড
জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরটি যেহেতু একটি অনন্য (ইউনিক) নম্বর, তাই এই নম্বরকেই স্বাস্থ্যকার্ড হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত পুরোপুরি ডিজিটালাইজড করা গেলে এ স্বাস্থ্যকার্ডের মাধ্যমে যে কোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেই কম্পিউটারভিত্তিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সহায়তায় উন্নত চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হবে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালুর জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে প্রতিটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে একটি সমন্বিত কম্পিউটারভিত্তিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থার (এইচএমআইএস) আওতায় আনা যেতে পারে। এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে নিচের সফটওয়্যার মডিউলগুলো থাকা প্রয়োজন—
১. রোগী নিবন্ধন ব্যবস্থা : যেখানে রোগীর ভোটার আইডি নম্বরসহ ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। এ তথ্য নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে সংগ্রহ করে রেখেছে; জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাই এখানে কাজে লাগানো যেতে পারে।
২. রোগী ভর্তি ও বিলিং ব্যবস্থা : রোগীর ভর্তি ও বিল-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের জন্য।
৩. রোগী ব্যবস্থাপনা (ইনডোর ও আউটডোর) : রোগীর রোগ-সংক্রান্ত তথ্য ও ব্যবস্থাপত্র সংরক্ষিত থাকবে এখানে।
৪. অস্ত্রোপচার (অপারেশন থিয়েটার) ব্যবস্থাপনা : রোগীর অস্ত্রোপচার-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার জন্য।
৫. ল্যাবরেটরি ও রেডিওলজি ব্যবস্থাপনা : রোগীর টেস্ট রিপোর্ট ও রেডিওলজি রিপোর্ট সংরক্ষণের জন্য।
৬. ফার্মেসি ব্যবস্থাপনা : হাসপাতালের ওষুধ-সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সংরক্ষণের জন্য।
৭. খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা : রোগীর খাদ্য ও পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের জন্য।
৮. মর্গ তথ্য ব্যবস্থাপনা : মৃত রোগীদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য।
৯. দূরবর্তী চিকিৎসা (টেলিমেডিসিন) ব্যবস্থা : ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বিভাগীয় শহরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে জেলা ও উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া যাবে। প্রয়োজনে বিদেশের কোনো হাসপাতাল থেকেও টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে সেবা নেওয়া সম্ভব হবে।
১০. জনবল ও বেতন-ভাতা ব্যবস্থাপনা : স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত তথ্য, বেতন, ছুটি ইত্যাদি সংরক্ষণের জন্য।
এ সফটওয়্যার মডিউলগুলো পর্যায়ক্রমে প্রথমে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চালু করা যেতে পারে, যা স্থানীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে সংরক্ষিত হবে। এভাবে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালকে কম্পিউটারভিত্তিক করে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অথবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় সার্ভার ও ডেটাবেজ স্থাপন করা যেতে পারে, যা কম্পিউটার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে।
এ ব্যবস্থা চালু হলে কী কী সুবিধা মিলবে
এক. ভোটার আইডি কার্ডের মাধ্যমেই যে কোনো রোগী যে কোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সেবা পাবেন।
দুই. কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত ল্যাবরেটরি ও রেডিওলজি রিপোর্ট যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখতে পারবেন।
তিন. ঢাকা মেডিকেলসহ বড় বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এ ব্যবস্থার মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও সেবা দিতে পারবেন।
চার. সরকার চাইলে জানতে পারবে, কোন হাসপাতালে কোন ধরনের রোগী কতজন এসেছেন এবং হাসপাতালগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাবও পাওয়া যাবে।
পাঁচ. চিকিৎসকদের দক্ষতা ও কর্মপরিধি সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে।
ছয়. রোগীদের সঠিক চিকিৎসা প্রদান ও মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হবে।
সাত. সরকারের গবেষণামূলক কাজ আরও গতিশীল হবে।
আট. সাধারণ মানুষের চিকিৎসাখাতে ব্যয় অনেকাংশে কমে আসবে, যা থেকে সরকারও উপকৃত হবে।
নয়. এ কম্পিউটারভিত্তিক ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার সঙ্গে জন্মনিবন্ধন ডিজিটালাইজড করা গেলে শিশুচিকিৎসার একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যাবে এবং দেশে প্রতি ঘণ্টায় কতজন শিশু জন্ম নিচ্ছে ও কতজন মানুষ মারা যাচ্ছে, তারও সঠিক পরিসংখ্যান মিলবে—যা জনশুমারি ও ভোটার তালিকা হালনাগাদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সরকারের অর্থনৈতিক সাশ্রয়ও নিশ্চিত করবে।
শেষ কথা
করিম মাস্টারের মতো লাখো মানুষের ভোগান্তি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি কাঠামোগত সংকট। সড়ক যোগাযোগে যেটুকু ঘাটতি আছে, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো দিয়ে আমরা সেই ঘাটতি পুষিয়ে দিতে পারি। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর সমন্বিত পরিকল্পনা—যাতে গ্রামের একজন করিম মাস্টারকেও শুধু একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য ঢাকায় ছুটে আসতে না হয়।
লেখক : প্রকৌশলী, সিনিয়র ডেপুটি ডিরেক্টর
এবং আইসিটি ও এমআইএস বিভাগের প্রধান
আহছানিয়া মিশন ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল, উত্তরা, ঢাকা