যখন সমবয়সীরা স্কুল মাঠে ছুটে বেড়ায়, তখন দূর থেকে তাদের খেলা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ১০ বছরের শিশু সাজ্জাদ ইসলাম নাঈম। ইচ্ছা থাকলেও দৌড়াতে পারে না। একটু হাঁটলেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেও শরীর কাঁপতে থাকে। জন্মের মাত্র ২৮ দিন পর ধরা পড়ে তার হৃদযন্ত্রে ফুটো (হার্টে ছিদ্র)। সেই থেকে চিকিৎসা, হাসপাতাল আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই বেড়ে ওঠা নাঈমের একটাই স্বপ্ন—সুস্থ হয়ে অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের ধুনট গ্রামের বাসিন্দা নাঈম। ২০১৫ সালে জন্ম নেওয়া এই শিশুটি বর্তমানে স্থানীয় বিনইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও লেখাপড়ায় তার আগ্রহ ও মেধার প্রশংসা করেন শিক্ষকরা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, জন্মের ২৮ দিনের মাথায় চিকিৎসকেরা নাঈমের হৃদযন্ত্রে ফুটো শনাক্ত করেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর উন্নত অস্ত্রোপচারের জন্য ভারতের বেঙ্গালুরুতে নেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার মিলিয়ে প্রয়োজন প্রায় আট লাখ টাকা।
এ বিপুল অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে পরিবার ইতোমধ্যে বিক্রি করেছে বসতভিটার এক শতক জমি, তিনটি গরু এবং জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ভ্যান। সব মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকা সংগ্রহ করা গেলেও বাকি ৫ লাখ টাকার অভাবে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
নাঈমের বাবা নূর মোহাম্মদ জানান, একসময় ভ্যান চালিয়ে সংসার চললেও ছেলের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে ভ্যান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন। অন্যদিকে মা সেলিনা বেগম সেলাইয়ের কাজ করে সংসারে সহযোগিতা করছেন।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সেলিনা বেগম বলেন, ‘ছেলেকে বাঁচানোর জন্য যা ছিল, সব বিক্রি করেছি। এখন আর কিছুই নেই। শুধু চাই, আমার ছেলেটা সুস্থ হয়ে আমাদের সামনে বেঁচে থাকুক। এখন সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষের সহযোগিতা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘নাঈম অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থী। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। দ্রুত অপারেশন না হলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’
সহপাঠী হোসেনের ভাষায়, ‘আমরা সবাই একসঙ্গে খেলি, কিন্তু নাঈম বেশি সময় খেলতে পারে না। অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যায়। আমরা চাই, ও দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার আমাদের সঙ্গে খেলুক।’
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে নাঈম বলে, ‘বন্ধুরা যা পারে, আমি তা পারি না। একটু দৌড়ালেই শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আমি সুস্থ হয়ে সবার মতো খেলতে চাই, পড়তে চাই।’
কালাই উপজেলা সমাজসেবা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। অনলাইনে আবেদন প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে সরকারি বিধি অনুযায়ী সম্ভাব্য সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।’
এ বিষয়ে কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম আরা বলেন, ‘লিখিত আবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হবে। সরকারি বিধি অনুযায়ী যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।’
সাহায্য পাঠাতে যোগাযোগ করতে পারেন: নূর মোহাম্মদ (নাঈমের বাবা) — ০১৭৫৮৪৪৭১৪৩ (নগদ)।
কেকে/এলএ