ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ১৫ দিন বয়সী এক কন্যাশিশুর মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার হাওরে একটি লাশবাহী ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় অস্ত্রধারী ডাকাতদল নৌকাটির গতিরোধ করে যাত্রীদের কাছ থেকে নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নৌকার সোলার প্যানেলের ব্যাটারিও লুট করে।
বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে নিহত শিশুটির দাদা আবদুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, তারা বারবার অনুরোধ করে নৌকায় একটি শিশুর মরদেহ রয়েছে বলে জানালেও ডাকাতরা কোনো করুণা দেখায়নি।
এর আগে মঙ্গলবার রাত প্রায় ১০টার দিকে করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও সুইজগেট (চাপনের সুইজগেট) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, মিঠামইন উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের চমকপুর গ্রামের বাসিন্দা বাবু মিয়ার সাত-আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়ের বাড়িতেই অপরিণত অবস্থায় একটি কন্যাশিশুর জন্ম হয়। জন্মের পর থেকেই শিশুটির শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়ার পর একজন নারী চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন তার মাকেও হাসপাতালে নেওয়া হয়। মা ও সন্তান—দুজনেরই চিকিৎসা চলছিল।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শিশুটি পাঁচ থেকে ছয় দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল। নির্ধারিত সময় ছাড়া কাউকে তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। মঙ্গলবার চিকিৎসকরা একটি পরীক্ষা করতে বলেন। পরীক্ষার জন্য সাড়ে তিন হাজার টাকা নেওয়া হয়। তবে পরীক্ষা করার প্রায় আধা ঘণ্টা পর, বিকেল ৪টার দিকে চিকিৎসকরা শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
শিশুটির মৃত্যুর পর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারটি করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা ঘাট থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করে। প্রথমে মাঝি ১০ হাজার টাকা ভাড়া চাইলেও পরে ৮ হাজার টাকায় রাজি হন। রাত পৌনে ১০টার দিকে হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিয়ে স্বজনরা নৌকায় ওঠেন এবং বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন।
নিহত শিশুটির দাদা আবদুল হক বলেন, ‘চাপনের সুইজগেট এলাকায় পৌঁছালে ইঞ্জিনচালিত একটি লম্বা কোষা নৌকায় করে ছয়জন অস্ত্রধারী ডাকাত আমাদের নৌকার গতিরোধ করে। তারা মাঝিকে ইঞ্জিন বন্ধ করতে বলে। মাঝি জানায়, এটি একটি লাশবাহী নৌকা। আমরাও বারবার বলেছি, নৌকায় একটি শিশুর মরদেহ রয়েছে। কিন্তু তারা কোনো কথা শোনেনি। হুমকি দিয়ে নৌকায় উঠে পড়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডাকাতরা প্রথমেই নৌকার ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা মূল্যের সোলার প্যানেলের বড় ব্যাটারি ও একটি ফ্যান খুলে নিয়ে যায়। এরপর আমাদের কাছে থাকা নগদ টাকা দিতে বাধ্য করে। বাইরে থাকা দুটি বাটন ফোন ও একটি স্মার্টফোন নিয়ে যায়। তবে মরদেহের বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখা আরও তিনটি স্মার্টফোন তারা খুঁজে পায়নি। যাওয়ার সময় নৌকার হ্যান্ডেলও খুলে নিয়ে যাচ্ছিল। পরে মাঝির অনুরোধে সেটি রেখে চলে যায়।’
এ ঘটনায় পরিবারটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে বলে জানান আবদুল হক। তিনি বলেন, ‘একটি শিশুর মরদেহ নিয়ে শোকাহত অবস্থায় বাড়ি ফিরছিলাম। সেই সময়ও নিরাপত্তা পেলাম না।’
নৌকার মাঝি রতন মিয়া বলেন, ‘রাতের দিকে নোয়াগাঁও সুইজগেট এলাকায় পৌঁছানোর পর হঠাৎ একটি ইঞ্জিনচালিত কোষা নৌকায় করে কয়েকজন অস্ত্রধারী ডাকাত আমাদের নৌকার গতিরোধ করে। তারা নৌকায় উঠে সবাইকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে বলে। কেউ কোনো ধরনের প্রতিবাদ করলে কিংবা চিৎকার করলে প্রাণনাশের হুমকিও দেয়।’
তিনি আরও বলেন, এরপর তারা নৌকার সোলার প্যানেলের ব্যাটারি খুলে নিয়ে যায়। পাশাপাশি যাত্রীদের কাছে থাকা নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন একে একে নিয়ে নেয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার টাকা এবং তিনটি মোবাইল ফোন লুট করে। নৌকায় একটি শিশুর মরদেহ রয়েছে—এ কথা তাদের বারবার বলা হলেও তারা কোনো করুণা দেখায়নি। সবাই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কিছুই করার ছিল না।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল কাদের বলেন, ‘হাওরের বিভিন্ন নৌপথে এখন মানুষ আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করে। বিশেষ করে রাতের বেলায় নিরাপত্তার অভাব সবচেয়ে বেশি। একটি লাশবাহী নৌকাও ডাকাতদের হাত থেকে রেহাই পেল না, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক ঘটনা।’
একজন নিয়মিত নৌযাত্রী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে অনেক মানুষ চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে নৌপথ ব্যবহার করেন। রাতে নিরাপত্তার অভাবে সবাই আতঙ্কে থাকেন। নৌপুলিশ ও প্রশাসনের নিয়মিত টহল থাকলে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে চলাচল করতে পারবে।’
কিশোরগঞ্জ জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি স্বপন কুমার বর্মন বলেন, ‘সম্প্রতি জেলার বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। কিছুদিন আগেও একই এলাকায় প্রায় ৪০ জন ডাকাতির শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান আর্থিক, সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে এসব অপরাধ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু ডাকাতিই নয়, অটোরিকশাচালকদের মারধর করে যানবাহন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে।’
করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেব খান বলেন, ‘ঘটনার বিষয়ে আমরা মৌখিকভাবে জেনেছি। তবে এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। নৌ পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
করিমগঞ্জ চামড়াঘাট নৌ পুলিশের ইনচার্জ মো. ইস্কান্দার বলেন, ‘ঘটনার কথা শুনেছি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
উল্লেখ্য, গত ৭ জুন রাতে জেলার মিঠামইন ও করিমগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় একটি পর্যটকবাহী ট্রলারে সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। সেদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় ৪০ জন পর্যটক কিশোরগঞ্জের হাওর ভ্রমণ শেষে মিঠামইন থেকে একটি ট্রলারে করে বালিখলা ঘাটের উদ্দেশে ফিরছিলেন। ট্রলারটি হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ১০ থেকে ১২ সদস্যের একটি ডাকাত দল ট্রলারে উঠে যাত্রীদের জিম্মি করে।
পরে যাত্রীদের মারধর করে তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নেয়। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও মিঠামইন থানা পুলিশের যৌথ দল ঢাকার সাভার, কামরাঙ্গীরচর এবং মিঠামইন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ডাকাত দলের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।
কেকে/ এমএস