টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। পানি নেমে যাওয়ার পর চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভেসে উঠছে ভয়ংকর ক্ষত। সামনে আসছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি তলিয়ে গেছে আমন ও আউশের বীজতলা, নষ্ট হয়েছে কৃষিজমি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ সড়ক। ডুবে গেছে নলকূপ ও পুকুর। অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকটে দুর্ভোগে রয়েছেন বন্যাকবলিত মানুষ।
আকস্মিক এই বন্যা ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে ৪৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। টানা ভারী বৃষ্টিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়াসহ বিভিন্ন উপজেলা প্লাবিত হয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এসব জেলার ৫৮টি উপজেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। সাত জেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বন্যা ও পাহাড় ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে পাহাড় ধস ও বন্যায় ২৩ জন মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। কক্সবাজারে আহত হয়েছেন ২৪ জন। বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামে বন্যা ও দেওয়াল ধসে ১১ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ঢলের পানিতে ভেসে ও পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ছয়জন। আহত হয়েছেন দুজন। রাঙামাটিতে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা মৌলভীবাজারে বন্যায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে ক্ষয়ক্ষতি:
জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলা ও মহানগরের ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার পানিবন্দি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন। পাহাড়ধস, দেওয়ালধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন পাঁচজন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, অনেক এলাকায় সাধারণ নৌকাও পৌঁছাতে পারছে না। তাই দুর্গম এলাকায় স্পিডবোট ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে। উদ্ধারকৃত মানুষের জন্য ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত আছে। বর্তমানে সেখানে ২৩ হাজার ৮৫০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। শুকনো খাবারের পাশাপাশি রান্না করা খাবারেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সড়কে বিভৎস ক্ষত:
বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষত তৈরি হয়েছে। পানির প্রবল স্রোতে কোথাও সড়ক ভেঙে গেছে, কোথাও ধসে পড়েছে সড়কের অংশ। উঠে গেছে পিচ ও কার্পেটিং। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়কের ভিত্তি, কালভার্ট ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। অনেক সড়কে এখনো পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দুর্গত এলাকার লাখো মানুষ।
বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার আগেই সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে চট্টগ্রাম জোনের ছয়টি সড়ক বিভাগের অধীন ২৪১ দশমিক ৩১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়ক জরুরি ভিত্তিতে সচল করতে স্বল্পমেয়াদে প্রায় ৩৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। আর স্থায়ী ও টেকসইভাবে পুনর্নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় হতে পারে প্রায় ২১০ কোটি ২৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা। দুই ধাপে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৪৪ কোটি ৮৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
সওজ কর্মকর্তারা বলছেন, এটি এখন পর্যন্ত প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। দুর্গত অনেক এলাকায় পানি থাকায় সড়কের প্রকৃত ক্ষতি পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের অধীন মোট ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার সড়ক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ দশমিক ৫০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৬ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ২৪ দশমিক ৭১ কিলোমিটার জেলা মহাসড়ক রয়েছে। চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো সংস্কারে স্বল্পমেয়াদে প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদে ১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে বলে প্রাথমিকভাবে হিসাব করেছে সওজ।
বন্যায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের সড়ক নেটওয়ার্কও। এ বিভাগের অধীন ৬৫ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়কের ১০ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়কের ১৭ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার এবং জেলা মহাসড়কের ৩৭ দশমিক ৮২ কিলোমিটার অংশ ক্ষতির শিকার হয়েছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারে ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। আর স্থায়ীভাবে মেরামত ও পুনর্নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ কোটি ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সড়ক নেটওয়ার্কেও বড় আঘাত হেনেছে বন্যা ও পাহাড়ি ঢল। কক্সবাজার সড়ক বিভাগের অধীন মোট ১৫ দশমিক ১৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়কের শূন্য দশমিক ৮৩ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়কের ৩ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার এবং জেলা মহাসড়কের ১০ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার অংশ রয়েছে। কক্সবাজার সড়ক বিভাগের ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক জরুরি ভিত্তিতে সচল করতে স্বল্পমেয়াদে ৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি মেরামত ও পুনর্নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম জোনের ছয় সড়ক বিভাগের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ব্যয়ের হিসাবে কক্সবাজারেই সবচেয়ে বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে।
পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে তুলনামূলকভাবে কম দৈর্ঘ্যরে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে মেরামত ব্যয় অনেক বেশি। রাঙামাটি সড়ক বিভাগের অধীন ২ দশমিক ৬ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়কের শূন্য দশমিক ৩৫ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়কের শূন্য দশমিক ৩১ কিলোমিটার এবং জেলা মহাসড়কের ১ দশমিক ৪০ কিলোমিটার অংশ রয়েছে। রাঙামাটিতে স্বল্পমেয়াদি সংস্কারে ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি মেরামতে ২৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের দৈর্ঘ্যরে দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে বান্দরবান সড়ক বিভাগ। বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে এ বিভাগের প্রায় ১০০ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম জোনে ক্ষতিগ্রস্ত মোট সড়কের বড় একটি অংশই বান্দরবানে। বান্দরবানে জাতীয় মহাসড়কের ১ কিলোমিটার এবং আঞ্চলিক মহাসড়কের ১ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে জেলা মহাসড়কে। এ শ্রেণির ৯৮ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার সড়ক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বান্দরবানের ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো স্বল্পমেয়াদে সংস্কারে ৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি মেরামতে ৩৮ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি সড়ক বিভাগের অধীন ৭ দশমিক ২২৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ বিভাগে কোনো জাতীয় মহাসড়ক ক্ষতির শিকার হয়নি। আঞ্চলিক মহাসড়কের ৪ দশমিক ৫০ কিলোমিটার এবং জেলা মহাসড়কের ২ দশমিক ৭২৫ কিলোমিটার অংশ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাগড়াছড়ির ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো স্বল্পমেয়াদে সংস্কারে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি মেরামতের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা।
ভেসে গেছে ১০ হাজার জলাশয়ের মাছ :
টানা বৃষ্টি ও বন্যায় চট্টগ্রামে প্রায় ১০ হাজার জলাশয় পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতি ৯১ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এখনো বিভিন্ন উপজেলায় বন্যার পানি রয়েছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী, লোহাগাড়া, আনোয়ারা ও সাতকানিয়া উপজেলায়। পরিপূর্ণ মাছ বাবদ ক্ষতি হয় ৬৫ কোটি টাকা। পোনা বাবদ ক্ষতি ২৩ কোটি।
চট্টগ্রাম বোর্ডে ১৬ জুলাই পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত :
বন্যা পরিস্থিতির কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম অধীনে অনুষ্ঠিতব্য আগামী ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
পাহাড়ে আর কোনো বসতি নয় : প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত :
পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঠেকাতে পাহাড়ের পাদদেশে আর কোনো বসতি থাকতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত সব পরিবারকে পর্যায়ক্রমে নিরাপদ স্থানে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা হবে। এজন্য সরকার প্রয়োজনীয় জমি ও আবাসনের ব্যবস্থা করবে। গতকাল চট্টগ্রাম নগরের আকবরশাহ এলাকার ১ নম্বর ঝিলের ওপর বায়তুন নুর জামে মসজিদসংলগ্ন ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় এ কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনা মোতায়েন :
চট্টগ্রাম জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় শুক্রবার থেকে সেনাবাহিনী এ উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের জরুরি অনুরোধে সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন বন্যাদুর্গত বিভিন্ন উপজেলায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
মৃত্যুপুরীতে পরিণত কক্সবাজার :
কক্সবাজারে গত এক সপ্তাহ ধরে চলা টানা ভারী বর্ষণ এবং তার ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৫ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত ছয় দিনে জেলায় পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিটি উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে সড়ক ব্যবস্থাও নাজুক হয়ে পড়েছে। জেলার এমন ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে বেশ সময় সাপেক্ষ মনে করছে সচেতন মহল।
টানা বৃষ্টির কারণে জেলার প্রায় ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে। এ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট এবং টেকনাফের সেন্টমার্টিনসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে ৪টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার করা হয়। বন্যা, পাহাড়ধস ও সাগরে ভেসে আসা লাশের এই মিছিল দেখে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্তমান কক্সবাজারকে ‘মৃত্যুপুরী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলাজুড়ে ২৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে এবং মক্তব-বসতবাড়ি মাটিচাপা পড়ে ১৩ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চকরিয়া, পেকুয়া, রামু এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে এবং পাহাড় ধসে আরও ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা মারা গেছেন। এদের মধ্যে সিংহভাগই শিশু ও নারী।
পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানির কারণে জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও পাহাড়ের পাদদেশ থেকে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ১৮২ জনকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বন্যায় ও পাহাড়ি ঢলে প্রায় ১ হাজার ৬১৪টি ঘরবাড়ি আংশিক এবং ১০টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম জানান, বান্দরবান শহর থেকে পানি নামতে শুরু করায় মাতামুহুরী নদীর পানিও বেড়েছে। ফলে চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার জানান, চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া দুর্গতদের শুকনো খাবারসহ জরুরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
খুলে দেওয়া হয়েছে ফেনীর মুহুরী সেচ প্রকল্পের ৪০ জলকপাট :
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও গত কয়েকদিনের অবিরাম বর্ষণে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অতিরিক্ত পানির চাপ সামলাতে এবং দ্রুত বঙ্গোপসাগরে নিষ্কাশনের লক্ষ্যে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ‘মুহুরী সেচ প্রকল্প’-এর ৪০টি জলকপাট বা রেগুলেটর গেট খুলে দেওয়া হয়েছে।
নেত্রকোনায় উপদাখালীর পানি বিপৎসীমার ওপরে :
টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার উপদাখালী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় কলমাকান্দা পয়েন্টে নদীটির পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, উপদাখালী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
সিলেট বিভাগে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত :
ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও সিলেট অঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে সিলেট বিভাগের লাখের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছে। বিভাগের হবিগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলেও মৌলভীবাজারে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বাকি দুই জেলার মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জে নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁইছুঁই। অন্তত সাত হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। খাবার ও সুপেয় পানির সংকটের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছে অনেকে।
টানা বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা শহরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত :
কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা শহরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছে সেখানকার বাসিন্দারা। গতকাল দুপুরের শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পৌরসভার কাটিয়া, কামালনগর, পলাশপোল, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ মোড়, সুলতানপুর, বদ্দীপুর কলনি, মধুমল্যার ডাঙি, মাঠপাড়া, মাছখোলার নিম্নাঞ্চলের গ্রামীণ সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে।
মান্দার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২০০ পরিবার পানিবন্দি :
টানা বৃষ্টিতে নওগাঁর মান্দা উপজেলার মৈনম ইউনিয়নের বর্দ্দপুর গ্রামে অবস্থিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রকল্পের ২০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রকল্পের বাসিন্দারা জানান, তাদের ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় তিন দিন ধরে অনেক পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলেনি।
রংপুরের ৫ জেলায় ফের বন্যার আশঙ্কা :
উজানের ঢল এবং টানা ভারি বৃষ্টির কারণে আবারও বন্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারে রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলা। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। গতকাল শনিবার প্রকাশিত বন্যা পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়। পাউবো কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান এ তথ্য জানিয়েছেন।
কেকে/ এমএস