রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬,
২৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: বন্যা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি নির্দেশনা      ভাঙ্গায় বাসচাপায় নিহত পাঁচ      ১৬ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত      রাতের মধ্যে চট্টগ্রামসহ ১৯ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু      দেশে ২৫ হজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী      জেলা-উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ঘুড়ে দাঁড়ানোর চেষ্টায় হোঁচট খাচ্ছে পুলিশ
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ১০:৩৭ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

চলছে জুলাই মাস। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দুবছর পূর্ণ হতে চলেছে। এসময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এলেও পুলিশ বাহিনীর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান সংস্কার এখনো স্পষ্ট নয়। বরং আস্থার সংকট, মব সহিংসতা, অভিযানে বাধা এবং আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনায় মাঠপর্যায়ে পুলিশের সক্ষমতা ও জনআস্থা পুনর্গঠনের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পুলিশের ওপর হামলার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় হামলার ঘটনাটি এ প্রবণতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

গত ৯ জুলাই বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় চুরির মামলার এক আসামির মৃত্যুর গুজবকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতা থানায় হামলা, ভাঙচুর এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থানায় হামলার ঘটনায় পুলিশের ৬ সদস্যসহ অন্তত ১২ জন আহত হন। গুরুতর আহত এক এএসআইকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

পুলিশের দাবি, আগের দিন নিয়মিত অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ওই আসামি থানার হাজতে নিজেই নিজের মাথায় আঘাত করে অসুস্থ হন। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনতা উত্তেজিত হয়ে থানার দিকে মিছিল নিয়ে যায় এবং হামলা চালায়।

হামলার পর রাতভর অভিযানে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনায় ৩৪৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। 

বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এ ঘটনাকে ‘নব্য মব সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে গুজবনির্ভর এ ধরনের হামলা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকিস্বরূপই নয়, এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচারপ্রক্রিয়া ও জননিরাপত্তার প্রতি মারাত্মক হুমকি এবং প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। 

হামলার পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে ‘মব’ বা উগ্র জনতার হাতে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ২২৫টি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম এক বছরে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা ও লাঞ্ছনার ঘটনায় রুজু হয়েছে ৫৬০টি মামলা।
মাসিক গড় হিসাবও পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। ২০২৪ সালে প্রতি মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় গড়ে ৫৪টি মামলা হয়। ২০২৫ সালে এই গড় ছিল ৪৯টি। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে প্রতি মাসে গড়ে ৫৩টি করে মামলা দায়ের হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১৭ মাসে পুলিশের ওপর হামলার সংখ্যা ৮৭০টি ছাড়িয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে অন্তত ২৬৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

৫ আগস্টের ধাক্কা ও পরবর্তী বাস্তবতা : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ৬৩৯টি থানার প্রায় সব কটিতেই হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি পুলিশ সদর দপ্তরেও হামলার ঘটনা ঘটেছিল।

সে সময় পুলিশের ৪৪ জন সদস্য নিহত হন এবং তিন শতাধিক সদস্য আহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় একদিনে ১৩ জন পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা সেসময়ের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে আলোচিত হয়।

হামলার ধরনে পরিবর্তন : মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, অভ্যুত্থানপূর্ব সময়ে পুলিশের ওপর হামলার অনেক ঘটনাই ঘটত রাতের আঁধারে বা নির্জন স্থানে। কিন্তু ২০২৪ সালের পর হামলার ধরন বদলে গেছে। এখন আসামি গ্রেপ্তার বা অপরাধবিরোধী অভিযানে গেলে স্থানীয় জনতা, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি কিংবা আসামির স্বজনেরা সংঘবদ্ধভাবে পুলিশকে বাধা দিচ্ছে। পুলিশের হেফাজত থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

এ ছাড়া সামান্যতম ইস্যুতেও থানা ও সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করা হচ্ছে। গত জুন মাসেও লালমনিরহাটের আদিতমারীতে একটি লাশ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আটক আসামিকে ছিনিয়ে নিতে স্থানীয়দের হামলায় পুলিশসহ ৩০ থেকে ৩৫ জন আহত হন এবং ৬টি সরকারি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সঙ্গে বেড়েছে গুজবের জেরে মব সহিংসতা। সম্প্রতি আগৈলঝাড়া থানার ঘটনাটি দেখিয়েছে, যাচাই না করা তথ্য মুহূর্তের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

কেন বারবার হোঁচট খাচ্ছে পুলিশ : অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পুলিশের ওপর হামলার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ কাজ করছে ১. আস্থার সংকট : ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে পুলিশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২. নৈতিক দুর্বলতা ও ট্রমা : অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ কাজ করেছে। ৩. বলপ্রয়োগে দ্বিধা : তীব্র সমালোচনার মুখে আইনসম্মতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ অতিরিক্ত সতর্কতা বা সহনশীলতা দেখিয়েছে। ৪. মব জাস্টিসের বিস্তার : আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ছোট ঘটনা থেকেও বড় ধরনের সহিংসতা সৃষ্টি হচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও মনোবল সংকট : বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, পুলিশের মনোবল পুরোপুরি ফিরতে না পারার পেছনে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কিছু দুর্বলতা ও অনিয়মও ভূমিকা রাখছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু কর্মকর্তা এখনো ঘুষ ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থেকে স্থানীয় রাজনীতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করছেন। এর ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, আবার কোথাও অপরাধের তথ্য থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে অনীহার অভিযোগ উঠছে।

এ ছাড়া পুলিশ বাহিনীর ভেতরে পদায়ন ও বদলি প্রক্রিয়াকে ঘিরেও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে, বিতর্কিত কিছু কর্মকর্তাকে অর্থের বিনিময়ে বা প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ ও বিতর্ক বাহিনীর পেশাদারত্ব এবং নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কিছু মহল দাবি করে, অতীতে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পুনঃপদায়ন বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সদস্যদের মনোবল পুনর্গঠনের জন্য শুধু বাহ্যিক হামলা প্রতিরোধ যথেষ্ট নয়। একইসঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী কঠোর ব্যবস্থা, স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক পদায়ন নীতি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাগত পরিবেশ গড়ে তোলাও জরুরি। তাহলেই পুলিশ বাহিনীকে সত্যিকার অর্থে একটি জনবান্ধব, পেশাদার ও আস্থাশীল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।

পুলিশের বর্তমান অবস্থান : পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাম্প্রতিক সময়ে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে পুলিশ আগ বাড়িয়ে কারও ওপর আক্রমণ করবে না। তবে দায়িত্ব পালনকালে হামলার মুখে পড়লে আইন অনুযায়ী এবং আত্মরক্ষার্থে প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কঠোর নির্দেশনা বা আইনগত ব্যবস্থা দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পুলিশের পেশাগত স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা, প্রশিক্ষণ, জনবান্ধব আচরণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কার্যক্রম নিশ্চিত না হলে জনআস্থা পুনর্গঠন কঠিন হবে।

গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনী নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু হামলা, মব সহিংসতা, আস্থার সংকট এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সেই প্রচেষ্টা বারবার হোঁচট খাচ্ছে। বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  ঘুড়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা   হোঁচট   পুলিশ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close