চব্বিশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া সাবেক স্বৈরশাসক ও বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার সাম্প্রতিক ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া দীর্ঘ এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করার সম্ভাব্য সময়সীমা ঘোষণা করেছেন। তার এমন ঘোষণা গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট করে তোলে যে, এ ফেরার বার্তা যতটা না বাস্তবসম্মত, তার চেয়ে অনেক বেশি কৌশলগত এবং এক ধরনের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বেরই অংশ।
স্বৈরতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী পতনপরবর্তী রাজনীতিতে ক্ষমতাচ্যুত শাসকদের এ ধরনের আকস্মিক ঘোষণা এক সুপরিচিত মনস্তাত্ত্বিক ছক। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের তত্ত্বের আলোকে যদি আমরা এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করি তবে দেখা যায় যে, কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পতনের পর পুরোনো শাসকগোষ্ঠী সহজে তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারাতে চায় না। যখন কোনো স্বৈরাচারী সরকার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অপসারিত হয় তখন তারা শুরুর দিকে এক ধরনের কৌশলগত অস্বীকৃতি বা ঘোরগ্রস্ততার মধ্যদিয়ে যায়, যেখানে তারা নিজেদের পতনকে সাময়িক বা ষড়যন্ত্রমূলক মনে করে মূল ধারার আলোচনায় টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।
শেখ হাসিনার এই পাঁচ বা ছয় মাসের একটি দীর্ঘ সময়সীমা দেওয়ার পেছনে প্রথম এবং প্রধান দৃষ্টিভঙ্গিটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রতিরক্ষামূলক। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের প্রথাগত সাংগঠনিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে।
বিশেষ করে ২০২৫ সালের ১২ মে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫” এবং ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’-এর ধারা-১৮(১) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপনে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর সব অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
একইসঙ্গে এ আদেশের ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন দলটির রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন স্থগিত ঘোষণা করে। পরে জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল ২০২৬’ পাস হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর সকল অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে। দলের শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতাদের বড় অংশ হয় কারাবন্দি, না হয় সম্পূর্ণ আত্মগোপনে কিংবা নির্বাসিত।
গত ২৩ জুন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে যে সামান্য চাঙ্গাভাব তৈরির চেষ্টা হয়েছিল, তা রাজপথে বা রাজনৈতিক অঙ্গনে বিন্দুমাত্র টিকতে পারেনি। এর পর থেকে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে যাচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার এ ঘোষণা মূলত দলটির তৃণমূল নেটওয়ার্ক ও পলাতক নেতাকর্মীদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাঙ্গা রাখার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। বিখ্যাত ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বোর্দিউর ‘সামাজিক পুঁজি’ ধারণার সূত্রে বলা যায়, শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিতে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, এই বার্তার মাধ্যমে শেখ হাসিনা তার ব্যক্তিগত ক্যারিশমাকে ব্যবহার করে সেই দলীয় নেটওয়ার্ক বা অবশিষ্ট পুঁজি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। যদি তিনি অতি দ্রুত বা আগামী মাসেই ফেরার কথা বলতেন এবং কোনো কারণে তা বাস্তবায়িত না হতো তবে কর্মীদের হতাশা আরও ঘনীভূত হবে। একটি দীর্ঘ সময় হাতে রাখার মাধ্যমে তিনি দলের নেতাকর্মীদের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা কৃত্রিম আশা জিইয়ে রাখলেন।
একইসঙ্গে দলটির ভেতর এখনো যে ২০ থেকে ৩০ শতাংশের তার একটি আনুগত্যশীল সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে, তাদের ধরে রাখা এবং দল যে এখনো সম্পূর্ণভাবে শেখ হাসিনাকেন্দ্রিক সেই বার্তাটি পুনর্ব্যক্ত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তবে প্রশ্ন থেকে যায় চব্বিশের ৫ আগস্টের পূর্বে যে নজিরবিহীন দমন-পীড়ন জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, তা পেরিয়ে এসে এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশল সাধারণ জনগণের ওপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে? কারণ মাঠের বাস্তবতায় বাকি বিশাল জনগোষ্ঠী ও অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক শক্তিগুলো এখনো কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থানে রয়েছে।
এ ঘোষণার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো অত্যন্ত সংবেদনশীল কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়, যার মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় অন্যতম। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা প্রায় ১৪০০ মানুষের প্রাণহানির সুনির্দিষ্ট বিবরণ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গৃহীত হয়েছে। ফলে পশ্চিমা বিশ্ব সাধারণত এ ধরনের স্বৈরাচারী বা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সাবেক শাসকদের সরাসরি রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়া থেকে বিরত থাকে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। তারা বরং দলটির ভেতর নতুন কোনো নেতৃত্ব বা অভ্যন্তরীণ সংস্কার আসে কিনা সেদিকেই নজর রাখতে আগ্রহী।
সমকালীন ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় শেখ হাসিনা বর্তমান ভারতের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক, বন্দর ব্যবহার ও বিনিয়োগের যে নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে তা ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের কৌশলগত অস্বস্তি তৈরি করেছে। ফলে শেখ হাসিনাকে নিজেদের আশ্রয়ে রেখে এবং তার দেশে ফেরার বা প্রত্যর্পণের সম্ভাবনাকে ঝুলিয়ে রেখে ভারত মূলত বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের ওপর একটি অবিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ বজায় রাখতে চাচ্ছে। এ দীর্ঘ সময়সীমার ঘোষণা বর্তমান সরকারকে এক ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি সতর্কতার মধ্যে রাখার একটি প্রচ্ছন্ন প্রয়াসও হতে পারে।
আইনি বাস্তবতায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলেই কি সহজে ফিরতে পারবেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং দেশীয় আইনি বাস্তবতার এক বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংঘাত সামনে আসে। আন্তর্জাতিক চুক্তির অনুচ্ছেদ ১২(৪) অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রই তার নিজস্ব নাগরিককে দেশে প্রবেশে নির্বিচারে বাধা দিতে পারে না। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিশেষ পরিস্থিতিতে সুরক্ষার স্বার্থে নাগরিকের প্রবেশাধিকার সাময়িকভাবে স্থগিত বা নিয়ন্ত্রণ করার নজির রয়েছে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ব্যবহারিক ও আইনি সংকটটি হলো ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা পাসপোর্ট। ক্ষমতাচ্যুতির পরপরই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার পাসপোর্ট অধ্যাদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী শেখ হাসিনার ডিপ্লোমেটিক পাসপোর্ট বাতিল করে দেয়। ফলে বর্তমানে তার কাছে বৈধ কোনো পাসপোর্ট বা ভ্রমণের দলিল নেই।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা এবং কমার্শিয়াল এয়ারলাইন্সের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বৈধ ট্রাভেল ডকুমেন্ট ছাড়া কোনো যাত্রীকে বোর্ডিং পাস দেওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। এর আগে ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনাকে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ তাকে লন্ডন বিমানবন্দরে বিমানে তুলতে অস্বীকার করেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি যদি নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদনও করেন, তবে বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত ছাড়া সেই পাস বা পাসপোর্ট ইস্যু হওয়া রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের নিয়ম অনুযায়ী অসম্ভব। আর ভারত সরকারও আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ নীতিমালার আইনি বাধ্যবাধকতার বাইরে গিয়ে সীমান্ত পার করে জোরপূর্বক কাউকে পুশইন করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও অপকূটনৈতিক পদক্ষেপ নেবে না। ফলে এই আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম ভাঙা শেখ হাসিনার জন্য এক প্রকার অসম্ভব বললেই চলে।
বর্তমানে অনেকেই শেখ হাসিনার ১৯৮১ সালের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং ২০০৭ সালের মাইনাস-টু ফর্মুলার সময়কার রাজনৈতিক লড়াইকে ২০২৪ সালের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে এক কাতারে ফেলে দেখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই তিনটি সময়কালকে মেলালে এক ধরনের সরলীকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইতিহাসের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নের নিজস্ব একটি অনন্য সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা থাকে, যা পূর্বের কোনো ঘটনার হুবহু পুনরাবৃত্তি নয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনা ছিলেন একটি মর্মান্তিক পারিবারিক ট্র্যাজেডি থেকে বেঁচে যাওয়া এক মানবিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী যার প্রতি তৎকালীন রাজনৈতিক পরিবেশে সাধারণ মানুষের গভীর সহানুভূতি ও নৈতিক সমর্থন ছিল।
অন্যদিকে ২০০৭ সালে তিনি ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কার বা মাইনাস-টু চাপের বিরুদ্ধে লড়াই করা একজন বিরোধীদলীয় নেত্রী যার পেছনে জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা জড়িয়ে ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ এবং গণঅভ্যুত্থানের চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। এটি কোনো আকস্মিক সামরিক অভ্যুত্থান বা কেবল দুটি রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক সংঘাত ছিল না এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের গুম-খুন, ভোটাধিকার হরন, রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর নজিরবিহীন দলীয়করণ, লাগামহীন দুর্নীতি, অর্থ পাচারসহ অগনিত অপকর্ম এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর রাষ্ট্রীয় ও দলীয় বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী বহিঃপ্রকাশ। ফলে পূর্বের ঘটনাগুলোতে যেখানে তার এক ধরনের নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের মৃত্যুদণ্ডের মতো সুনির্দিষ্ট বিচারিক রায় বলবৎ রয়েছে। অতীতের রাজনৈতিক সহানুভূতি বা জনপ্রিয়তা কখনো ভবিষ্যতের আইনি ও নৈতিক জবাবদিহিতার বিকল্প হতে পারে না।
যদি সব আইনি ও কূটনৈতিক বাধা পেরিয়ে শেখ হাসিনা দেশের মাটিতে পা রাখেনও তবে তা বর্তমান সরকারের জন্য এবং দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ক্ষোভ, শোক ও আবেগ এখনো এদেশের সাধারণ মানুষ, শহীদ পরিবার ও আহতদের মাঝে অত্যন্ত তীব্র ও জীবন্ত। ক্ষমতাচ্যুত কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসকের বন্দিত্ব বা বিচারিক মুখোমুখি হওয়া সমাজে এক নতুন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাকে কারাগারে বা আদালতের হেফাজতে রাখা রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল অতিরিক্ত বোঝা ও স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠতে পারে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভেতরের একাংশ মনে করছে এই পরিস্থিতিতে দলের প্রধান বা শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার হওয়া বা কারাবন্দি থাকাই হয়তো এক অর্থে নিরাপদ কৌশল হতে পারে যা দীর্ঘমেয়াদে কারাগারের ধারণক্ষমতা ও আইনি ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক ধরনের রাজনৈতিক সহানুভূতি তৈরির সুযোগ দেবে।
অন্যদিকে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও বিরোধী শিবিরের মতে যিনি দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে এদেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পথ সুগম করেছিলেন তার মুখে এ আইনি নমনীয়তা বা আত্মসমর্পণের সুর এক ধরনের রাজনৈতিক প্রহসনই মাত্র। তাদের মতে এটি আসলে উগ্র ও স্বৈরাচারী মানসিকতার এক ধরনের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব যেখানে পরাজয় নিশ্চিত জেনেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনা ও গণমাধ্যমের কেন্দ্রে থাকার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের এ প্রত্যাবর্তন বার্তাটি মূলত একটি সুদূরপ্রসারী মনস্তাত্ত্বিক ছক। ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লুকসের ‘ক্ষমতার তিনটি মাত্রা’ তত্ত্ব অনুযায়ী ক্ষমতা কেবল দৃশ্যমান রাজপথের রাজনীতিতে থাকে না তা থাকে মানুষের রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ন্ত্রণ এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারের মধ্যেও। এ দীর্ঘ সময়সীমার মাধ্যমে শেখ হাসিনা মূলত নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে প্রচার-প্রচারণায় টিকিয়ে রাখার ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন ভেঙ্গে পড়া দলীয় কর্মীদের একটি কাল্পনিক আশার আলো দেখানো হচ্ছে অন্যদিকে বর্তমান সরকারের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হওয়া মামলার রায়, বৈধ পাসপোর্টের অনুপস্থিতি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নেতিবাচক মনোভাব এবং দেশের অভ্যন্তরে বিরাজমান তীব্র জনক্ষোভ সব মিলিয়ে এ ফেরার পথ বাস্তবতার নিরিখে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ।
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কাল্পনিক ঘোষণা রাজনীতিতে আলোচনা ও প্রচারণায় থাকার একটি কৌশল মাত্র। কিন্তু ইতিহাসের জটিলতা ও নির্মম বাস্তবতাকে শুধু কথার জালে বা কূটনৈতিক বার্গেনিং দিয়ে আড়াল করা যায় না। শেখ হাসিনা বা তার দল সত্যিই এ রাজনৈতিক ও আইনি জুয়া খেলবেন কি না, নাকি এটি শুধুই আলোচনার কেন্দ্রে থাকার এক সাময়িক প্রয়াস তা দেখার জন্য এদেশের সচেতন রাজনৈতিক মহলকে অবশ্যই আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত অত্যন্ত নিবিড়ভাবে অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক
কেকে/ এমএস