একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু সড়ক, সেতু কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তার প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় রাষ্ট্র তার নদী, বন, পাহাড় ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল, তার ওপর। কারণ, প্রকৃতিকে ধ্বংস করে অর্জিত উন্নয়ন কখনো টেকসই হয় না। বাংলাদেশের উচ্চ আদালত দেশের সব নদীকে জীবন্ত সত্তা বা জুরিস্টিক পারসন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রাষ্ট্রের সেই সাংবিধানিক ও নৈতিক দায় আরও সুস্পষ্ট করেছেন। কিন্তু আইনের এই অগ্রগতি বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তার উত্তর খুঁজতে দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; সুনামগঞ্জের আন্তঃসীমান্ত নদী যাদুকাটার বর্তমান বাস্তবতাই তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
ভারতের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা যাদুকাটা শুধু একটি নদী নয়; এটি হাওরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য, পর্যটন, স্থানীয় অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম ভিত্তি। অথচ দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত বালু-পাথর উত্তোলন, নদীতীর ধ্বংস, দুর্বল প্রশাসনিক তদারকি এবং ত্রুটিপূর্ণ ইজারা ব্যবস্থার কারণে এই নদী আজ অস্তিত্বের সংকটে। প্রশ্ন তাই কেবল একটি নদীকে ঘিরে নয়; প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের খনিজসম্পদ ব্যবস্থাপনা কি স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব ও মুনাফার জন্য পরিচালিত হবে, নাকি পরিবেশ, মানুষের জীবিকা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে একটি টেকসই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে?
যাদুকাটা নদী যুগের পর যুগ হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার উৎস। একসময় স্থানীয় শ্রমিকেরা হাতে বেলচা, নেট-জালি ও বিশেষ ধরনের নৌকা ‘বারকি’ ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে বালু-পাথর সংগ্রহ করতেন। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হতো না, আবার স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও নিশ্চিত থাকত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই শ্রমনির্ভর সনাতন ব্যবস্থা স্থান ছেড়ে দেয় ড্রেজার, বোমা মেশিন ও শ্যালোচালিত যন্ত্রনির্ভর বাণিজ্যিক আহরণকে। অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ উত্তোলনের প্রতিযোগিতা নদীর তলদেশ, তীর ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছে, ইজারাকৃত বালুমহালের নির্ধারিত সীমার বাইরে রাতের আঁধারে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন, নদীতীর কেটে নেওয়া এবং অবাধে বাণিজ্যিক আহরণ চলছে। কোথাও কোথাও নদীর প্রস্থ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, বিলীন হয়েছে কয়েক কিলোমিটার নদীতীর। ঝুঁকির মুখে পড়েছে বসতভিটা, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও যোগাযোগব্যবস্থা। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায় নির্ধারণ অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তবে একই ধরনের অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে ফিরে আসা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে সংকটটি বিচ্ছিন্ন নয়; এটি বিদ্যমান ইজারা কাঠামোর একটি মৌলিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
এ কারণেই এখন শুধু অবৈধ ড্রেজিং বন্ধের আলোচনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন খনিজসম্পদ ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংস্কার। বর্তমান ইজারা পদ্ধতিতে স্বল্প সময়ে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত আহরণকে উৎসাহিত করে। ফলে নদীর ধারণক্ষমতা, পরিবেশগত ভারসাম্য কিংবা স্থানীয় জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ গুরুত্ব হারায়। রাষ্ট্র সাময়িক রাজস্ব পেলেও নদী হারায় তার স্বাভাবিক চরিত্র, আর স্থানীয় মানুষ হারায় নিরাপদ জীবন-জীবিকার ভিত্তি।
তবে সমাধান কখনোই সব ধরনের বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া নয়। কারণ, এই খাতের সঙ্গে হাজারো শ্রমজীবী পরিবারের জীবন জড়িয়ে আছে। প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যেখানে বৈধ, সীমিত, বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশসম্মত উপায়ে সম্পদ আহরণ চলবে এবং একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রতিবেশ সংরক্ষিত থাকবে। উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়েছে। এখন প্রয়োজন এমন রাষ্ট্রীয় নীতি, যেখানে মানুষের কর্মসংস্থান ও প্রকৃতির সুরক্ষা একই কাঠামোর অংশ হবে।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হতে পারে শ্রমনির্ভর সনাতন উত্তোলন পদ্ধতির পুনঃপ্রবর্তন। ড্রেজারনির্ভর ব্যাপক বাণিজ্যিক আহরণের পরিবর্তে স্থানীয় নিবন্ধিত শ্রমিকদের হাতে বেলচা, কোদাল, নেট-জালি ও বারকি নৌকার মাধ্যমে সীমিত পরিসরে বালু-পাথর উত্তোলনের সুযোগ দিতে হবে। এতে একদিকে নদীর ওপর যান্ত্রিক চাপ কমবে, অন্যদিকে হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হবে। বড় সিন্ডিকেটের পরিবর্তে শ্রমিক সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
একই সঙ্গে খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের বালুমহাল ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার জরুরি। ইজারা প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া শতভাগ ডিজিটাল করতে হবে, যাতে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ কমে। প্রতিটি বালুমহালের সীমানা জিপিএস ও জিওফেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। নিয়মিত ড্রোন নজরদারি, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ এবং ডিজিটাল ওয়ে-ব্রিজ ব্যবহারের মাধ্যমে উত্তোলনের পরিমাণ ও পরিবহন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। প্রতিটি বালুবাহী নৌকার জন্য ডিজিটাল অনুমতি ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হলে অবৈধ আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে।
বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর নদীর তলদেশ, বালুর পুনঃসঞ্চয়ন, প্রবাহ এবং পরিবেশগত ধারণক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে কোথায়, কতটুকু এবং কত সময় পর্যন্ত বালু উত্তোলন করা যাবে। নদীতীর, বসতিপূর্ণ এলাকা এবং ভাঙনপ্রবণ অঞ্চলকে স্থায়ীভাবে ‘নো মাইনিং জোন’ ঘোষণা করতে হবে। পাড় কাটা, গভীর গর্ত সৃষ্টি কিংবা যান্ত্রিক উত্তোলনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। জেলা প্রশাসন, পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ইজারার সব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ, অভিযোগ গ্রহণের ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু এবং পরিবেশগত ক্ষতির জন্য ইজারাদারের আর্থিক দায় নিশ্চিত করতে হবে। নদী ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু ইজারা বাতিল নয়, ক্ষতিপূরণ আদায়ও বাধ্যতামূলক হতে হবে।
স্থানীয় জনগণকেও এই ব্যবস্থাপনার অংশীদার করতে হবে। নদীপাড়ে নাগরিক পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন, অবৈধ ড্রেজিংয়ের তথ্য দ্রুত প্রশাসনকে জানানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নদী সংরক্ষণবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নদীতীরে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিক, গবেষক ও নাগরিক সমাজের স্বাধীন নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমতও একই দিকে ইঙ্গিত করে। নদীকে কেবল বালুর উৎস নয়, একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নদীর মাঝখানে পুনঃজমাকৃত বালু বৈজ্ঞানিকভাবে উত্তোলন করা যেতে পারে, কিন্তু নদীতীর কাটা কিংবা নদীর স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করার কোনো সুযোগ থাকতে পারে না। প্রশাসনিক অভিযান প্রয়োজন হলেও, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে নদী রক্ষা সম্ভব নয়।
যাদুকাটা আজ কেবল একটি নদীর নাম নয়; এটি বাংলাদেশের খনিজসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সুশাসন এবং টেকসই উন্নয়নের একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। আমরা যদি এখনো স্বল্পমেয়াদি মুনাফার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে না পারি, তাহলে হারিয়ে যাবে শুধু একটি নদী নয়; বিপন্ন হবে হাওরের পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা।
অতএব, এখনই সময় ইজারা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের। খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এমন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শ্রমনির্ভর সনাতন পদ্ধতিতে বালু-পাথর উত্তোলনকারী প্রকৃত শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, পরিবেশগত সীমা কঠোরভাবে মানা হবে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ অক্ষুণ্ন রাখা হবে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা প্রকৃতিকে ধ্বংস না করে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করে।
যাদুকাটা আজ আমাদের সামনে সেই কঠিন কিন্তু অনিবার্য সিদ্ধান্তের আহ্বান জানাচ্ছে—নদী কি কেবল রাজস্বের উৎস, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণযোগ্য জাতীয় সম্পদ? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে শুধু যাদুকাটার নয়, বাংলাদেশের নদীনির্ভর সভ্যতার ভবিষ্যৎ।
লেখক : জনপ্রতিনিধি ও হাওর উন্নয়নবিষয়ক চিন্তক
কেকে/এলএ