দুই সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ সদর উপজেলার বিস্তির্ণ এলাকা। এতে ভেঙে পড়েছে স্যানিটেশন ব্যবস্থা, ডুবে গেছে বাড়িঘর ও ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত রোগ। পৌরসভায় অচল হয়ে পড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও শহরতলীতে অপরিকল্পিতভাবে মাছের ঘের করাকে জলাবদ্ধতার কারণ বলছেন ভুক্তভোগীরা। এছাড়া অতিবর্ষণে জেলার কোটি টাকারও অধিক মাছ ভেসে গেছে। ছয় হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, ১-১৫ জুলাই পর্যন্ত সাতক্ষীরায় ৪৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস, যার মধ্যে ৮ জুলাই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ১৭৯ মিলিমি।
সাতক্ষীরা পৌরসভার কামালনগর, ইটাগাছা, মধুমোল্যারডাঙ্গী, বদ্দীপুরকলোনী, মধ্যকাটিয়া, রইচপুর, রাজারবাগান, পুরাতন সাতক্ষীরাসহ সদর উপজেলার বিস্তির্ণ এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এতে বেড়েছে চরম নাগরিক দুর্ভোগ।
ডুবে যাওয়া ঘর-বাড়িতে রান্না-বান্না দুষ্কর। সাপ ও পোকা-মাকড়ের উপদ্রুবে আতঙ্কিত জনসাধারণ। রাস্তা জলমগ্ন থাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে অনেক এলাকায়।
বদ্দীপুর কলোনীর জাহেদা খাতুন জানান, আমরা ১ যুগ ধরে এ অবস্থায় আছি। বৃষ্টি হলেই এই এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। রান্না-বান্না করা সম্ভব হয় না। ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতে পারে না। প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মধ্যে বসবাস করে আমরা ন্যূনতম নাগরিক সেবা পাই না।’
রইচপুর এলাকার রাহিনুর রহমান জানান, বৃষ্টির পানি এতটুক সরছে না। রইচপুরের নিচের দিকে অনেকগুলো মাছের ঘের। তাই পানি সরতে পারছে না। দীর্ঘদিন জমা পানি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। তাই ঘরে ঘরে চর্মরোগ বেড়েছে।’
ইটাগাছা এলাকার এনামুল হক জানান, আমাদের পরিবারের সবার পায়ে ঘা-পাঁচড়া হয়েছে। একদিকে যেমন প্রচুর চুলকাচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালা-যন্ত্রনাও করছে। “
মধ্যকাটিয়া এলাকার আমেনা খাতুন জানান, আমাদের পুরো রাস্তা পানিতে ডুবে আছে। ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতে পারেনা। তারওপর এখন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে পরীক্ষা। মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসে ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা যাতে ভালো হয়, তার জন্য। আর আমাদের কি কপাল! জলাবদ্ধতার কারণে ঘর থেকে বের হতে পারিনা।
শহরে বিধিবহির্ভূত ভবন নির্মাণ করা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। এছাড়া শহরতলীতে যত্রতত্র মাছের ঘের জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ বলে মনে করেন নাগরিক অধিকার উন্নয়ন কমিটির সহ-সভাপতি আবুল কালাম বাবলা।
তিনি বলেন, ‘সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ সদর উপজেলার অধিকাংশ জায়গায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীরা পড়েছে বিপাকে। রসুলপুর ও কামালনগরসহ বিভিন্ন জায়গায় এই যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, এটা দূর করতে খালগুলো গভীর করতে হবে। এছাড়া যারা যত্রতত্র মাছ চাষ করছে, পানি আটকে রাখছে-এগুলো অপসারণ করা আমাদের দাবি। এছাড়া নেটপাটা অপসারণ করাও জরুরি।’
ক্ষয়-ক্ষতির বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রুহুল আমিন বলেন, ‘অতিবর্ষণে জেলার ৬৩টি প্রাইমারি স্কুল জলাবদ্ধতার কবলে রয়েছে। এর মধ্যে আশাশুনি উপজেলায় ২০টি, কলারোয়ায় ১০টি, তালায় ১টি, শ্যামনগরে ১২টি ও সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ২০টি স্কুল ভয়াবহ জলাবদধতার কবলে পড়েছে। চেয়ার-বেঞ্চ ডুবে যাওয়ায় সেসব স্কুলগুলোতে ক্লাস চালানো খুবই কষ্টের। তবুও কোমলমতি শিশুদের কথা ভেবে কষ্ট করে হলেও ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার বাগডাঙ্গি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস পরিচালনা করতে পারছেননা শিক্ষকরা।’
জেলা মৎস্য অফিসার জিএম সেলিম জানান, বৃষ্টির পানিতে দুই শতাধিক মাছের ঘের ভেসে গেছে, যার আনুমানিক ক্ষয়-ক্ষতি কোটি টাকা।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ছয় হাজার হেক্টর আউশ ধানের ক্ষতি হয়েছে। আর কিছু সবজি ক্ষেত পঁচে গেছে।’
পৌরসভাসহ সাতক্ষীরা সদর উপজেলার জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত।
তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ের মতো এবারও কিছু পয়েন্ট করে সেখানে কেটে বা ড্রেন করে বা খাল খনন করে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রক্রিযা চলছে। বিশেষ করে বদ্দীপুর কলোনীতে জলাবদ্ধতা প্রকট। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কলুবোল্লার খালের যে অংশে চর পড়েছে, সেই অংশ খনন করে পানির প্রবাহ ঠিক রাখা। আর কামালনগর খালের বিষয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে সমাধানের চেষ্টা করব। আর সিল্টেড স্লুইস গেটগুলো, যেগুলো জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ, সেগুলো অপসারণের চেষ্টা করছি। এগুলো বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা নিরসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হবে।’
কেকে/এমএ