‘চীনা বাদাম’ একটি লাভজনক ও পুষ্টিকর ফসল। উৎপাদন খরচ ও পরিশ্রম কম হওয়ায় এটি চাষে ঝুঁকছেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার চাষিরা। চলতি মৌসুমে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৪ হেক্টর জমিতে চীনা বাদাম চাষ করে লাভের স্বপ্ন বুনছেন কৃষকরা। ধান চাষে যেমন খরচ, তেমনি রোপণের পর থেকে দুঃচিন্তায় থাকতে হয় কৃষকরা। তবে বাদাম আবাদের পর তা নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয় না। এমন কথাই বললেন কৃষক রামাকান্ত পাল।
সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার সাতগাঁও, মির্জাপুর, কালাপুর, সিন্দুরখানসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে পুষ্টিকর ফসল চীনা বাদামের ব্যাপক আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সিন্দুরখান ইউনিয়নে ৪ বিঘা, মির্জাপুর ইউনিয়নে ৩ বিঘা, ভুনবীর ইউনিয়নে ৩ বিঘা, শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নে ৩ বিঘা, কালাপুর ইউনিনে ৩ বিঘা, আশিদ্রোন ইউনিয়নে ৩ বিঘা, সাতগাঁও ইউনিয়নে ২ বিঘা, রাজঘাট ইউনিয়নে ২ বিঘা এবং কালিঘাট ইউনিয়নে ২ বিগা চীনা বাদাম আবাদ হয়েছে।
উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নের ভাগলপুর গ্রামের বাদাম চাষি রামাকান্ত পাল বলেন, এবার প্রথমবারের মতো তিনি ১০ শতক জমিতে চীনা বাদাম চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন। অতিবৃষ্টির কারণে আগাম বাদাম তুলেও তিনি প্রায় ২৫ কেজি বাদাম সংগ্রহ করেছেন। চাষি রামাকান্ত পালের ভাষ্যে, এবার অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষেতে কিছুটা পানি জমে যাওয়ায় তিনি আগাম বাদাম ঘরে তুলতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক বাদাম তোলা সম্ভব হয়নি। নতুবা আরও বেশি বাদাম সংগ্রহ করা যেত। তার আবাদ করা বাদাম খেতেও খুব সুস্বাদুর কথা জানান তিনি।
চাষি জানান, চীনা বাদাম চাষে তার পরিশ্রম ছাড়া কোনো খরচ হয়নি। বীজ, সার সবই কৃষি অফিস দিয়েছে। আগামীতে ব্যাপক পরিসরে চীনা চাষের আশা করছেন এ কৃষক। সাতগাঁও এলাকার চীনা বাদাম চাষি সাধন দাস বলেন, কম খরচে বেশি লাভবান হওয়ায় আমি এবার ৩৩ শতক জমিতে চীনা বাদাম চাষ করেছি। বাম্পার ফলন হয়েছে। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আশা করছি বিক্রি করে লাভবাবন হতে পারব। চাষি জানান, এ বাদাম চাষে খরচ নাই বললেই চলে। পরিশ্রম করলেই এটি লাভজনক ফসল। তাকে বীজ ও সার প্রদান করেছে স্থানীয় কৃষি অফিস। উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে এবার শ্রীমঙ্গল উপজেলার আমরাইলছড়া, সাতগাঁও, শ্রীমঙ্গল সদর, ভূনবীর, সিন্দুরখান, আশীদ্রোন ও কালাপুর এলাকায় চীনা বাদামের আবাদ হয়েছেটি ৫টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলনের আশা করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিভাগ বলছে, এ উপজেলার মাটি বাদাম চাষের উপযোগী। তাই কৃষকদের বাদাম চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন আশা জাগিয়েছে কৃষকদের মাঝে। অনেকে আগামীতে এ বাদাম চাষে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। চাষিরা জানান, ধানের তুলনায় চীনা বাদামে খরচ কম এবং লাভও বেশি। এটি একটি লাভজনক ও পুষ্টিকর ফসল। কম খরচে বেশি লাভবান হওয়ায় উপজেলার অনেক কৃষক এখন চীনা বাদাম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। শুরুতে কৃষকের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও মাঠ পর্যায়ে সার্বক্ষণিক পরামর্শ প্রদান করছে কৃষি বিভাগ। বর্তমানে উপজেলার কৃষকরাও এ ফসল দেখে উৎসাহিত হয়েছেন এবং আগামী মৌসুমে বাদাম চাষে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কম খরচে অধিক লাভ এবং পুষ্টিগুণের কারণে শ্রীমঙ্গলে চীনা বাদামের আবাদ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে কৃষকদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ ফসল। তবে সরকারি সহায়তা বাড়ানো গেলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
কৃষি ও পুষ্টিবিদরা জানান, আড়াই থেকে তিন মাসের মধ্যে বাদাম ঘরে তোলা যায়। পাশাপাশি বাজারে দামও ভালো। চীনা বাদাম পুষ্টিকর একটি শস্য। মুখরোচক ও যথেষ্ট পুষ্টিগুণ রয়েছে। এতে রয়েছে প্রোটিন, ফাইবার, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ভিটামিন-ই ও ক্যালসিয়ামসহ নানা পুষ্টি উপাদান। এটি হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে, রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুকুর রহমান জানান, শ্রীমঙ্গলের মাটি ও আবহাওয়া চীনা বাদাম চাষের জন্য উপযোগী। তাই কৃষকদের এ ফসল আবাদে উৎসাহিত করা হচ্ছে। শুরুতে কৃষকের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও মাঠ পর্যায়ে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং আবাদ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কৃষকদের মাঝে প্রণোদনা সহায়তা প্রদান ও প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানান, এবার উপজেলায় মোট ৪ হেক্টর জমিতে চীনা বাদামের আবাদ হয়েছে। ৫টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। ভালো ফলনও হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চীনা বাদামের দাম ও ফলন দুটোই ভালো হওয়ায় কৃষকদের বাদাম চাষে দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে। এতে কৃষকের মুখে হাসি ফুটছে।
কেকে/ এমএস