গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় জরায়ু টিউমার অপসারণে অস্ত্রোপচারের সময় গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় গৃহবধূর স্বজনরা আমরাইদ জেনারেল হাসপাতালের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন। তবে নিহতের স্বজন বা তাদের পক্ষে কোনো অভিযোগ দেয়া হয়নি। এছাড়া হাসপাতালের বিরুদ্ধে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ব্যবস্থা নিতে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকালে আমরাইদ জেনারেল হাসপাতালে জরায়ুর টিউমার অপসারণের জন্য নিয়ে যায় মৃতের স্বামী শামীম ও তার স্বজনরা।
মৃত আরিফা (৩০) উপজেলার বারিষাব ইউনিয়নের নয়ানগড় গ্রামের দিনমুজুর শামিমের স্ত্রী। তিনি দুই কন্যা সন্তানের জননী।
শনিবার (১৮ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টায় নিজ বাড়ীতে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। আমরাইদ জেনারেল হাসপাতাল উপজেলার আমরাইদ বাজারে অবস্থিত।
মরহুমা গৃহবধূর খালা শাশুড়ি হুসনা বলেন, ‘বিকাল ৫টার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীকে স্যালাইন দেয়। স্যালাইন দেওয়ার পর রোগী কান্না শুরু করে। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে অপারেশন (ওটি) কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে অপপারেশন শুরু করার ১০ মিনিট পর বিদ্যুৎ চলে যায়। ২০ মিনিট চলে গেলেও জেনারেটর দেয় না। আমরা চিৎকার শুরু করি আমাদের রোগী আছে দাতলায়, জেনারেটর দিচ্ছেন না কেন? অন্ধকারে আপনারা কি করতেছেন? স্বজনেরা সবাই চিৎকার শুরু করলে তারা (হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ) জেনারেটর লাইন দেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাত ৯টা বেজে গেলেও রোগী বের করে না। পরে মামুন ডাক্তার জানান, রোগীর সমস্যা হয়েছে, হার্ট ব্লক হয়ে গেছে। রোগী বের করা যাবে না। এখান থেকে বের করে সরাসরি ঢাকা পপুলার হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। পপুলারে আপনাদের রোগী নিয়ে যেতে পারলে বাঁচবে। তখন জিজ্ঞিাসা করলাম আমার রোগী পপুলারে নিয়ে গেলে বাঁচবে, না নিয়ে গেলে বাঁচবে না! তাহলে কি রোগী মারা গেছে? না রোগী মারা যায়নি সে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। তাহলে রোগী বের করেছেন না কেন? সবাই কান্নাকাটি শুরু করলে হাসপাতালের লোকজন শান্তনা দেয়, রোগী নামাচ্ছি। অপানারা কান্নাকাটি করবেন না, রোগী আমরা নিচে নিয়ে দেখাব। রোগী সুস্থ আছে। থেরাপি দিলে এবং আইসিইউতে নিলে আপনাদের রোগী বেঁচে যাবে। আমরা আপনাদের কথা মানি না।’
হুসনা বলেন, ‘রাত সাড়ে ৯টা বেজে গেছে এখনো রোগী বের করছেন না কেন? আমাদের রোগী কি মারা গেছে নাকি? পরে আমাদেরকে নিচে নামতে বললে আমরা নিচে নেমে অপেক্ষা করি। তারা বলে আমাদের অ্যাম্বুলেন্স আসতেছে, রোগীর সাথে আপনাদের দুইজন সুস্থ মানুষ যেতে হবে। কিছুক্ষন পর দেখি আমাদের রোগীর লাশ দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সের ভিতর ঢুকাচ্ছে। তখর লাশ দেখে আমরা স্বজনরা কান্নাকাটি শুরু করি। বুঝতে পারি, রোগী নাড়াচাড়া করে না মারা গেছে এবং তার হাত-পা শক্ত হয়ে গেছে। পরে পুলিশ এসে কয়েকটা কাগজে আমাদের স্বাক্ষর নিয়ে লাশ বুঝিয়ে দেয়।’
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের বউ সুস্থ মানুষ তার টিউমার অপারেশনের জন্য বাড়ি থেকে হেঁটে হাসপাতালে যায়। রাতে খবর পাই বউ মা আরিফা মারা গেছে। তার ছোট দুইটা মেয়ে রয়েছে।’
হুসনা দাবি করেন, চিকিৎসকদের অবহেলার অপারেশন থিয়েটারেই আরিফার মৃত্যু হয়েছে।
আমরাইদ জেনারেল হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
কাপাসিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ নাসির আহমদ বলেন, ‘আমরাইদ জেনারেল হাসপাতালে অপারেশনের সময় রোগী মৃত্যুর খবর শুনে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। কেউ অভিযোগ দিলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমরাইদ জেনারেল হাসপাতালে অপারেশনের সময় রোগী মৃত্যুর ঘটনা শুনেছি। তবে, রোগীর স্বজনদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্তে চিকিৎসায় অবহেলা প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে আমরাইদ জেনারেল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি তানিয়া আক্তারে (১৯) মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় একই বছরের ২৫ এপ্রিল কাপাসিয়া উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসমত আরা হাসপাতালটি সিলগালা করেছিলেন।
কেকে/এমএ