মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: হামে শিশুমৃত্যু ৭০০ ছাড়াল      গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সরকার কঠোর: ডা. জাহেদ      শারমিন হত্যা মামলায় পিবিআইয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য      সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের দুটি প্যাকেজ ঘোষণা      বিশ্বে ২৯ মিলিয়ন শিশু এখনও হামের টিকার সুরক্ষার বাইরে      আ.লীগের সাজাপ্রাপ্তদের ফেরাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার      কাঁপছে দিল্লির মসনদ      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষায় আল-আরাফাহ ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করুন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ১১:৫০ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন শুধু কাগুজে রদবদল নয় এটি লাখো আমানতকারীর আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৫ জুলাই আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির জন্য যে ১৪ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দিয়েছে, তা সেই আস্থার প্রশ্নেই নতুন করে সংকট তৈরি করেছে। 

নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব ছিল একটি দুর্বল, খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংককে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে, তা অনেকটাই বিপরীত একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক পরিবারের প্রভাব খর্ব করার বদলে তাকে আরও সংহত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের হিসাব বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংক মনোনীত পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক বাদ দিলে অবশিষ্ট ১৪ জনের মধ্যে সাতজনই চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপ ও এর চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানের পরিবার বা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (সংশোধিত ২০২৩) স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, একক পরিবার থেকে তিনজনের বেশি এবং সর্বোচ্চ দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি একই সময়ে পরিচালক থাকতে পারবেন না। অথচ নতুন পর্ষদে এ সীমা প্রকাশ্যেই লঙ্ঘিত হয়েছে। আইন যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিজের হাতে গঠিত পর্ষদেই মানা হয় না, তখন প্রশ্ন ওঠে স্বাভাবিক এ ব্যতিক্রম কার স্বার্থে? 

শেয়ারহোল্ডারদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের পর কেডিএস গ্রুপ ও এস আলম গ্রুপের প্রভাব বিস্তারের পরবর্তী প্রায় ১৬ বছরে ব্যাংকটির প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক দুর্বলতা তৈরি হয়। এর পরিণতি আজ পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট, প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার মোট বিনিয়োগের মধ্যে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকাই এখন খেলাপি ঋণ; শ্রেণিবিন্যাসিত বিনিয়োগের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ শতাংশে; ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ব্যাংকটি লোকসান গুনেছে প্রায় ৮৬ কোটি টাকা; এবং টানা দুই অর্থবছর লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হয়ে শেয়ারবাজারে ব্যাংকটির অবস্থান ‘এ’ থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে। এ ধারাবাহিক অবনতির পেছনে যে গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণকে দায়ী করা হচ্ছে, পুনর্গঠিত পর্ষদে সেই একই গোষ্ঠীর প্রাধান্য কীভাবে সংস্কারের পথ দেখাবে, তা বোধগম্য নয়। 

ব্যাংকের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনই এ উদ্বেগকে আরও জোরালো করে। গুলশান শাখার এফএম এগ্রো ফুডস ও জেকটা লিমিটেডের ঋণ লেনদেন ঘিরে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা একটি ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থা কতটা ভেঙে পড়তে পারে তার একটি খারাপ দৃষ্টান্ত। হিসাব খোলার অল্প সময়ের মধ্যেই শাখা পরিবর্তন, প্রায় ৩৫ কোটি টাকার প্রাথমিক ঋণসীমা থেকে ধারাবাহিক বৃদ্ধি, জামানত ছাড়াই সুবিধা প্রদান, আমদানি পণ্যের প্রকৃত মূল্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অনুপস্থিতি, ব্যাংক গ্যারান্টি খেলাপি হয়ে জোরপূর্বক ঋণে রূপান্তর প্রতিটি ধাপই ইঙ্গিত দেয় প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির বদলে ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছার প্রাধান্যের। 

২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এ দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ২১৬ কোটি টাকারও বেশি, যার বড় অংশ এখন খেলাপি। বিদেশে সম্পদ ক্রয়ের অভিযোগ, আদালতের বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থপাচারের মামলা এসব মিলিয়ে যে চিত্র ফুটে ওঠে, তাতে জবাবদিহির দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে, তদারকিতে শৈথিল্যে দেখালে তার ভুক্তভোগী হবে সাধারণ আমানত কারীরা। 

এ প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বিষয়ে অবিলম্বে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি বাংলাদেশ ব্যাংককে গঠিত পর্ষদ ব্যাংক কোম্পানি আইনের পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বের সীমা মেনে চলছে কি না, তা স্বাধীনভাবে পুনর্যাচাই করে প্রয়োজনে সংশোধন করতে হবে। অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে আসা ঋণ অনিয়ম, অর্থপাচার ও মালিকানা গোপনের অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, শুধু সুপারিশে সীমাবদ্ধ না রেখে। প্রতিষ্ঠাকালীন স্পন্সর শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানা হস্তান্তরসংক্রান্ত জাল স্বাক্ষরের অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত মালিকানা কাঠামো প্রকাশ্যে নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকটির ঋণ অনুমোদন ও তদারকি প্রক্রিয়ায় স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বজায় রাখতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায় ও আর্থিক পুনরুদ্ধারের সুনির্দিষ্ট সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা প্রকাশ করে শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। 

একটি ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কোনো একক পরিবার বা গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না তা নির্ভর করে আইনের শাসন, স্বচ্ছ তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে এ সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনী পদক্ষেপ নেওয়া, যাতে হাজার হাজার আমানতকারীর অর্থ ও আস্থা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close