মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬,
২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতায় প্রস্তুত সরকার: প্রধানমন্ত্রী      চাঁদপুরে যাত্রীবাহী বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ১৫      বিএনপির পরিকল্পনা-কর্মসূচি সবসময়ই জনবান্ধব : প্রধানমন্ত্রী      প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী      হাসিনা ও হাদি হত্যাকারীদের ফেরাতে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের অনুরোধ      প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠক      শহর-গ্রামে ডেঙ্গুর ভয়      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
কূটনীতি না যুদ্ধ: ইরান-মার্কিন দ্বন্দ্বের দ্বিধাবিভক্তি
সাইয়েদ হোসেইন মুসাভিয়ান
প্রকাশ: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ১১:১৬ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ইরান ও আমেরিকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত জুনে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকটিকে ১৯৭৯ সালের পর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু এ নিয়ে পারস্পরিক আস্থা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হয় এবং কূটনীতি ধসে পড়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে চুক্তিটি ভেস্তে যাওয়ায় ওয়াশিংটনের সামনে এখন খুব কম বিকল্পই খোলা রয়েছে।

গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে আমেরিকা ও ইরানের সংঘর্ষের কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশেরও বেশি এ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। শুক্রবার তেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে ৮৮ ডলার ছাড়িয়ে যায়—যা এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। সংঘাতটি এখন শুধু আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি হামলায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি পুরো আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

জেরুজালেম ডিসপ্যাচ

আমেরিকার সাম্প্রতিক সামরিক কৌশল দেখে মনে হচ্ছে, তারা এখন আর দ্রুত কোনো সামরিক বিজয় খুঁজছে না। বরং তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতা, রসদ সরবরাহ, অর্থনৈতিক সচলতা এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে ধীরে ধীরে দুর্বল করার জন্য এক এট্রিশন ওয়ারফেয়ার-এর পথ বেছে নিয়েছে।

সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আমেরিকা নতুন করে যে অবরোধ আরোপ করেছে, তার মূল উদ্দেশ্য ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া। ওয়াশিংটন এখন পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে সামরিক চাপ বজায় রাখা, সমুদ্রপথ ব্যাহত করা এবং নিজের আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করার দিকেই মূল মনোযোগ দিচ্ছে—যাতে এ ফাঁকে ইসরায়েল তার ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করার সময় পায়।

মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আমেরিকা ইরানের খার্গ দ্বীপ দখল করে নিতে পারে। পাশাপাশি, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে উসকে দিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটানোর পরিকল্পনাও আমেরিকা ও ইসরায়েল করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব থেকে স্পষ্ট যে, তাদের ভবিষ্যৎ কৌশল হলো একদিকে যেমন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করা, অন্যদিকে সীমান্ত এলাকায় অস্থিতিশীলতা তৈরি করা।

আমেরিকার এ আক্রমণের জবাবে ইরানও এমন এক কৌশল নিয়েছে, যা তাদের জনগণকে একতাবদ্ধ করার পাশাপাশি এ যুদ্ধের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

গত মার্চ মাসে ইরান ঘোষণা করে যে, তারা দেশে মার্কিন স্থল হামলা ঠেকানোর জন্য ১০ লাখ যোদ্ধা প্রস্তুত করছে। তাদের বিশেষ নজর থাকবে খার্গ দ্বীপে, যেখান থেকে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়।

আঞ্চলিক স্তরে ইরান তার সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর (যেমন ইয়েমেনের হুথি) মাধ্যমে মার্কিন জোটের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। হুথিরা যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌপথ অবরোধ করে, তবে হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশ্ব অর্থনীতি চরম চাপে পড়বে। সম্প্রতি হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধেও নৌ-অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে।

উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ইরান কুয়েত, ওমান, সিরিয়া, জর্ডান, বাহরাইন ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে। ইরান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে যে—যারা মার্কিন বাহিনীকে ঘাঁটি বা সামরিক সহায়তা দেবে, তারা এ যুদ্ধের ছাই থেকে বাঁচতে পারবে না। ইরানি সামরিক মুখপাত্র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, মার্কিন হামলা অব্যাহত থাকলে যুদ্ধ নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।

যদিও এই বৈরী সম্পর্কের গোড়াতে রয়েছে দীর্ঘদিনের ইসরায়েল-ইরান দ্বন্দ্ব, তবে এই নতুন পর্বটি মূলত আমেরিকা ও ইরানের সরাসরি সামরিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। তবে এর খেসারত দিতে হচ্ছে ইরান, আমেরিকা, আরব দেশগুলো এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির শিকার হওয়া পুরো বিশ্বকে।

এক বছরের কিছু বেশি সময়ের ব্যবধানে টানা তিনটি যুদ্ধ উভয় পক্ষেরই বিশাল মানবিক ও আর্থিক ক্ষতি করেছে, কিন্তু চূড়ান্ত বিজয় কাউকেই দিতে পারেনি। এটি প্রমাণ করে যে, যুদ্ধটি একটি অচলাবস্থায় আটকে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি জো রোগানের পডকাস্টে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মন্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট স্বীকার করেছেন যে, ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কোনো কৌশলগত স্বার্থ আমেরিকার নেই; কূটনীতিই একমাত্র টেকসই পথ।

ভ্যান্সের সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য ছিল এটিই যে—ইসরায়েল সরকারের কিছু অংশ চায় না আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আলোচনা সফল হোক। তারা জনমতকে আলোচনার বিপক্ষে নেওয়ার জন্য বিপুল অর্থ ঢেলে প্রচার চালাচ্ছে, যাতে সামরিক অভিযানকে অনির্দিষ্টকালের জন্য টিকিয়ে রাখা যায়। ভ্যান্স জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের উচিত বাহ্যিক রাজনৈতিক চাপের চেয়ে আমেরিকার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া। তিনি টেকসই শান্তির জন্য দুটি প্রধান বিষয়ের কথা উল্লেখ করেন। প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয়ত, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেজন্য আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো।

এটা মানতে হবে যে, হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের ভূখণ্ডীয় সীমানার অন্তর্ভুক্ত। তাই এই নৌপথের নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব তাদেরই থাকা উচিত। তবে আরব উপসাগরীয় দেশগুলো, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একটি ব্যাপক সমঝোতা থাকতে হবে, যা আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের নিশ্চয়তা দেবে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের মাধ্যমে এ ব্যবস্থার আইনি বৈধতা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

ওয়াশিংটন ও ইরানের উচিত এনপিটি (NPT)-এর ভিত্তিতে একটি স্থায়ী দ্বিপক্ষীয় পরমাণু চুক্তি করা। এর অধীনে ইরান স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র পরিহার করবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) নজরদারিতে থাকবে। বিনিময়ে আমেরিকা পারমাণবিক-সংক্রান্ত সব নিষেধাজ্ঞা চিরতরে তুলে নেবে এবং ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তির অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে। এই চুক্তিটি অবশ্যই মার্কিন কংগ্রেস ও ইরানি পার্লামেন্ট—উভয় স্থান থেকেই পাস হতে হবে, যাতে ট্রাম্পের মতো কেউ এটি হুট করে বাতিল করতে না পারে।

আমেরিকা বা ইরান—কোনো পক্ষই বলপ্রয়োগ করে অন্য পক্ষকে পরাস্ত করতে পারবে না। আসল পছন্দটি হলো ‘অনন্তকালের যুদ্ধ’ অথবা ‘টেকসই কূটনীতি’—এর মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়া।

উভয় দেশেরই উচিত আলোচনা পুনরায় শুরু করা। ভ্যান্স এবং ইরানি স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এ কূটনৈতিক ধারাকে নতুন গতি দিতে পারে।

আমেরিকান জনগণ এই যুদ্ধের চরম বিরোধী, যা ভিয়েতনাম যুদ্ধের চেয়েও বেশি অপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, সাধারণ ইরানিরা চায় স্থায়ী সংঘাত ছাড়া নিরাপত্তা, বিপ্লব ছাড়া সংস্কার এবং আত্মসমর্পণ ছাড়া কূটনীতি। উভয় সরকারেরই উচিত নিজ নিজ দেশের জনগণের এ আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে সংঘাতের সমাপ্তি ঘটানো।

লেখক: প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সাবেক প্রধান। মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন ফরহাদ নাইয়া।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ইরান   মার্কিন দ্বন্দ্ব  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close