দেশে আবারও জ্বালানি তেলের সংকটের কথা বলে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিশেষ চক্র এই মিশনে নেমেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সংকট নিয়ে কিছু খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। কয়েক মাস আগেও জ্বালানি তেল নিয়ে দেশজুড়ে গুজব ছড়ানো হয়। তখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে কিছু সংকট তৈরি হয়। কিন্তু সেই অসুবিধাকে পুঁজি করে দেশের মধ্যে কিছু চক্র তেল বাণিজ্য করে। আর সাধারণ গ্রাহকও বেশি পরিমাণে জ্বালানি তেল কিনতে দিনের পর দিন পাম্পে ভিড় করেন। এবারও সেই চক্র
৩১ দিনের ডিজেল মজুত, আগস্টেও সমস্যা হবে না :
কর্মকর্তারা বলেছেন, বর্তমানে ৩১ দিনের ডিজেলের মজুত রয়েছে। ফলে আগস্টেও সরবরাহে সমস্যা হবে না। দেশে সংকট তৈরির চেষ্টা থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী এসব কথা বলেন।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সংকট নিয়ে প্রকাশিত খবরের পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে মন্ত্রণালয়। গুজব ও বিভ্রান্তি দূর করতেই এ ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, জ্বালানি তেলের কোনো সংকট এই মুহূর্তে নেই। ডিজেলের মজুত আছে প্রায় ৩১ দিনের। অকটেন আছে ৩৬ দিনের। পেট্রোল আছে ২০ দিনের। ফার্নেস অয়েল আছে ২৫ দিনের এবং জেট ফুয়েল আছে ২০ দিন। ফলে নরমালি আমাদের যা থাকার কথা তার চেয়ে অনেক বেশি। আর আমাদের সাপ্লাই চেইনে পর্যাপ্ত সাপ্লাই চেইন আছে আমাদের, যেটা দিয়ে আমাদের আগামী জুলাই-আগস্ট মাস পর্যন্ত আমাদের কোনো সমস্যা নেই।
তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি ধীরে ধীরে দেড় মাস, ৬০ দিন এবং এক পর্যায়ে যাতে এটাকে ৯০ দিনে উন্নীত করা যায়, সেই চেষ্টা করার আমাদের অব্যাহত আছে। ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আরও এক লাখ টন ডিজেল দেশে পৌঁছাবে। আগস্ট মাসে আসবে আরও দুই লাখ ৪০ হাজার টন। ফলে জুলাই ও আগস্টজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, আমার মনে হয় যে কোথাও কোনো একটা সংকট তৈরি করার চেষ্টা থেকে এই গুজবটা তৈরি করা হয়েছে। এটা অ্যাবসোলিউটলি আপনাদের মাধ্যমে আমরা চাই যে, সঠিক তথ্যটা যাতে মানুষ পায়।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রভাব নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশ মূলত চীন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ দূরপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলছে না। কেবল অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে বিকল্প সরবরাহ পথ নিয়ে সরকার কাজ করছে।
এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি, ছড়ানো হয় ভুয়া খবর :
কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। এতে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন গ্রাহকরা।
জানা গেছে, দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। দেশে এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম। এর মধ্যে দুটি টার্মিনাল থেকে ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছিল। হঠাৎ কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহ ৬০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে। এতে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। আর এ খবরকে ভুলভাবে ছড়িয়ে দেশে জ্বালানি সংকটকে সামনে আনার পাঁয়তারা করা হচ্ছে।
মধ্যরাতে রাজশাহীর ফিলিং স্টেশনে ভিড় :
ফেসবুকে জ্বালানি তেলের সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার রাতে রাজশাহী নগরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। সন্ধ্যার পর থেকে ভিড় বাড়তে শুরু করে, তবে দিবাগত রাত ১২টার দিকে ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকা কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে ভিড় উপচে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে রাজশাহী জেলা প্রশাসন রাতেই জরুরি জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি দেয়। জানায়, জেলায় জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে। সরবরাহব্যবস্থাও স্বাভাবিক আছে। গুজবে কান না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেল কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়।
গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান মালিক সমিতির :
দেশের কোনো পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি তেলের সংকট নেই বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলেছে, দেশের সব পেট্রোল পাম্পে পর্যাপ্ত তেল মজুত রয়েছে এবং গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ অব্যাহত আছে। এ অবস্থায় গুজবে কান না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেল কেনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এক বার্তায় সংগঠনটি জানায়, দেশের সব পেট্রোল পাম্পে পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও তেলের সংকট নেই। তাই কোনো ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
বার্তায় আরও বলা হয়, অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কিনে মজুত করার প্রবণতা বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অযাচিত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দেশের জ্বালানি তেল ক্রেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, স্বাভাবিকভাবে যার যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই জ্বালানি তেল সংগ্রহ করুন। কোনো গুজবে কান না দিয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কেকে/ এমএস