দেশের রাজনীতিতে আদর্শিক, নৈতিক ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার জন্য পরিচিত অন্যতম দল জামায়াতে ইসলামী। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু নেতার নৈতিক স্খলনসহ নানা অসঙ্গতির কারণে ইমেজ সংকটে পড়েছে দলটি। এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরে যেমন তৈরি হয়েছে অস্বস্তি, তেমনি নৈতিক অবস্থান নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠছে। সবশেষে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের নৈতিক স্খলনের ঘটনা দলটিকে মারাত্মক বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের পর প্রথমে সেটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন দলীয় সমর্থকেরা। পরে দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে সম্পাদিত বিতর্কিত চুক্তিপত্র এবং ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে চাকরিসংক্রান্ত নথিতে সুপারিশের তথ্য প্রকাশ্যে এলে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। শেষ পর্যন্ত দলীয় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর আরও দুটি ভিডিও ভাইরাল হয়।
এদিকে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে চিঠি দিয়েছে জামায়াত। এর আগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনকেও আলাদা চিঠি দেয় জামায়াত। গতকাল বৃহস্পতিবার জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার চিঠিটি পাঠিয়েছেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে পরিচালিত সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, গত ২২ জুলাই আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্পিকারকে লেখা চিঠিতে বলা হয়, গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি তার অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দাখিল করা হলো। চিঠির অনুলিপি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
গাজী নজরুল ইসলামের আগেও কয়েকজন সংসদ সদস্যকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। রংপুর-৬ আসনের এমপি মো. নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের সরকারি বরাদ্দ আত্মীয়-স্বজনের নামে বণ্টনের অভিযোগ ওঠে। নড়াইল-২ আসনের এমপি আতাউর রহমানের মেয়ের নাম প্রধানমন্ত্রীর ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদানের তালিকায় থাকা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এছাড়া নীলফামারী-৪ আসনের এমপি আব্দুল মুনতাকিম সংসদে নিজের পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা থাকার দাবি করেন এবং বলেন, তার বাবা ও দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তার নির্বাচনী হলফনামায় জন্মতারিখ ১০ জানুয়ারি ১৯৮১ উল্লেখ থাকায় বক্তব্যটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে সংসদের কার্যবিবরণী থেকে তার ওই বক্তব্য বাদ দেওয়া হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের এমপি মু. মিজানুর রহমান বাজেট আলোচনায় সরকারি ফ্ল্যাটে ওভেন ও ওয়াশিং মেশিন সরবরাহের দাবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। দলটির আরেক সংসদ সদস্য মুফতি আমীর হামজাকে নিয়েও বিভিন্ন সময়ে নানা বিতর্ক সামনে এসেছে। এর বাইরে বিভিন্ন জেলায় জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উঠছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজি, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে সরকারি মালামাল বণ্টনে অনিয়ম, সাতক্ষীরার তালা ও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে জমি দখলের চেষ্টা এবং যশোরের মণিরামপুরে নদী খননের মাটি বিক্রির অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষের মতো ঘটনাগুলো দলকে বিব্রত করেছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত গ্রুপিং এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলও বেড়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির এক নেতা বলেন, আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে একজন নেতার নৈতিক পতন পুরো সংগঠনের ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তার মতে, নেতাদের ব্যক্তিগত আচরণ, নৈতিক বিচ্যুতি কিংবা বহিরাগত প্রভাব ও সম্ভাব্য হানিট্র্যাপ মোকাবিলায় একটি স্বাধীন তদারকি ও তথ্য সেল গঠন জরুরি। অন্যথায় প্রতিপক্ষ বা বিভিন্ন সংস্থার ফাঁদে পড়ে দলের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
তবে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ এ ধরনের উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, এসব ঘটনা কোনো সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রতিফলন নয়; বরং ব্যক্তির তাকওয়া, ঈমানি দৃঢ়তা ও আধ্যাত্মিকতার ঘাটতির ফল। তার ভাষ্য, জামায়াত কখনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয় না এবং অতীতের মতো এখনো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জনগণের প্রত্যাশা তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে সামান্য নৈতিক বিচ্যুতিও তাদের ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মীর্জা গালিবের মতে, ক্ষমতার প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের সংকটও বাড়বে। তাই অপরাধের ক্ষেত্রে আপসহীন সাংগঠনিক অবস্থান গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু মনে করেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে প্রায় সব দলই একই ধরনের সংকটে পড়ে। তবে জামায়াত যদি আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে আসে, তাহলে তাদের মূল সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যেই বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ বিভক্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এদিকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দাবি করেন, বিচ্ছিন্ন যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর বিষয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।
কেকে/এলএ