কয়েকদিনের আলোচনা-সমালোচনার পর অবশেষে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছে তা নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও সরকার বা বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো আভাস মেলেনি। তবে সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার পর জাতীয় সংসদকে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা চলাকালে নির্ধারিত বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার সকালে দেশে ফেরেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এদিন বিকেল ৫টার কিছুসময় পর সংসদ ভবনের শপথকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং তিনি নিজে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন বলে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান।
পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন লিখেছেন, ‘৫ আগস্ট ২০২৪ সনে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়। সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়ে সরকার পরিচালনা করছে। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন। এমতাবস্থায়, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করছি।’
সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার বলেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে তার স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে দাখিল করেন। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। একই সঙ্গে পদত্যাগপত্রটি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ডে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
স্পিকার জানান, রাষ্ট্রপতি তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি গুরুতর অসুস্থ। তিনি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। তার হৃৎযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে এবং সম্প্রতি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ রোগের কারণে তিনি মাঝে মাঝে অচেতন হয়ে পড়েন। এসব শারীরিক জটিলতা ও মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেছেন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে শপথ গ্রহণের সময়ই প্রয়োজন হলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের শপথও নেওয়া থাকে। একইভাবে স্পিকারের পদ শূন্য হলে ডেপুটি স্পিকার স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। এখন স্পষ্ট হয়েছে যে তিনি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যগত কারণেই পদত্যাগ করেছেন। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতির সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্পিকার বলেন, একজন রাষ্ট্রপতি অসুস্থ হতে পারেন এবং তিনি লিখিতভাবে তার অসুস্থতার কারণ উল্লেখ করেছেন। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কোনো চিকিৎসা সনদের প্রয়োজন নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে সব ধরনের ধোঁয়াশা, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তার অবসান হবে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ কখনো শূন্য থাকে না। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন। দেরিতে হলেও জাতির ঘাড় থেকে স্বৈরাচারের একটা কালো ছায়া সরে গেল।
একইসঙ্গে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করায় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে অভিনন্দন জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি যতদিন দায়িত্ব পালন করবেন, পক্ষপাতিত্ব না করে ন্যায়নিষ্ঠভাবে, নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং রাষ্ট্রপতির মর্যাদা রক্ষা করে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জামায়াত আশা করে। এ ক্ষেত্রে জামায়াত তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের ভেতরে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হবে। যেহেতু এর ভেতরেই সংসদ অধিবেশন হওয়ার কথা রয়েছে, কাজেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়তো বা সেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সময় এলে আমাদের ভূমিকা কী হবে, ইনশা আল্লাহ আপনারা দেখতে পাবেন।’
জামায়াতের আমির বলেন, ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই বাংলাদেশে যে পরিবর্তন হয়েছিল, সেই পরিবর্তনের দাবি ছিল এই রাষ্ট্রপতি থাকবেন না। কারণ, তিনি রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় বেশ কটি অঘটন ঘটেছে। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানে এতগুলো মানুষের জীবন গিয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে তিনি কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। শুধু নীরবতা নয়, জনগণ মনে করে তিনি এই অপকর্মের মদদদাতাও ছিলেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণে সরকারি দল সন্তোষ প্রকাশ করেছে উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘কারণ, শেখ হাসিনার নিয়োগ দেওয়া রাষ্ট্রপতির মুখ দিয়ে তারা হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বলাতে পেরেছে। এটাকেই তারা বিজয় ভেবেছে। তবে জনগণ এটা পছন্দ করেনি।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের যে মধুর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেখানে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। যার ফলে তিনি আজ পদত্যাগ করেছেন। শুক্রবার দলটির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।
হান্নান মাসউদ বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনে যাতে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার কোনো সহযোগী বক্তব্য দিতে না পারেন, সেজন্য আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। সংসদের ভেতরে প্রতিবাদ জানিয়েছি, সংসদের বাইরেও প্রতিবাদ করেছি। জুলাই যোদ্ধারা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। জুলাইয়ে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের স্বজন এবং শহীদদের পরিবারের সদস্যরাও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, কিন্তু বিএনপি সরকার সবকিছু উপেক্ষা করে জুলাই-পরবর্তী এই রক্তস্নাত সংসদে তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। আমরা এর প্রতিবাদে সংসদ থেকে বের হয়ে আসি এবং ওয়াকআউট করি।
কেকে/এলএ