শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬,
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় প্রধানমন্ত্রীর      রাষ্ট্রপতি সংবিধানবিরোধী কাজ করলে তার শাস্তি হওয়া উচিত: নাহিদ      শাপলা চত্বর হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু ২৭ জুলাই: চিফ প্রসিকিউটর      সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নতুন অধ্যায়ে রাষ্ট্র      রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফশিল দ্রুত ঘোষণা করা হবে: ইসি মাছউদ      নতুন রাষ্ট্রপতি ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করবে সংসদ      কে হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি?      
খোলাকাগজ স্পেশাল
তীব্র গ্যাস সংকটে দেশ
রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ১০:০৩ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রাজধানীসহ সারা দেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, বাসাবাড়িতে চুলার স্বল্পচাপ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বেড়েছে সাধারণ ভোক্তাদের দুর্ভোগ।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালটি মেরামতে যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা বাংলাদেশে আসছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ দেশে রয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ শুরু করলে অল্প সময়ের মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনালটির সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (৪৫ কোটি ঘনফুট) গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে না

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক বাসাবাড়িতে দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা যাচ্ছে না। মধ্যবাড্ডার আদর্শনগর এলাকার বাসিন্দা দুলাল মিয়া বলেন, ‘সকালে গ্যাসের চাপ খুব কম থাকায় রান্না করা যায় না। এ কারণে রাতে রান্না করে রাখি।’

মিরপুরের বাসিন্দা শামছুন্নাহার বেগম বলেন, ‘চুলায় গ্যাস নেই বললেই চলে। আগুন খুবই কম জ্বলছে। রান্না করতে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে।’

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার বা গভীর রাতে রান্নার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন

রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দিন-রাত দীর্ঘ লাইনে গ্যাসের অপেক্ষায় থাকছেন যানবাহনের চালকরা। তারা বলছেন, রাজধানীর বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেই। যেগুলোতে আছে, সেখানেও চাপ খুব কম। সে কারণে সিলিন্ডারের অর্ধেক পরিমাণও গ্যাস ভরা যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক স্টেশন পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। কোথাও কোথাও ‘গ্যাস নেই’ নোটিশও টাঙানো হয়েছে। গ্যাসের সংকটে রাজধানীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চলাচল কমে গেছে, বেড়েছে ভাড়া।

রাইড শেয়ারিংয়ে ভাড়ায় গাড়ি চালান গাবতলী এলাকার আজমল হোসেন। তিন দিন ধরে গ্যাস সংকটে নাকাল তিনি। তিনি বলেন, ‘গাবতলীতে অনেক পাম্প, কিন্তু বেশিরভাগই বন্ধ। সাভার এলাকার পাম্পগুলোও বন্ধ। আজকে একটা ট্রিপ নিয়ে গেছিলাম ডেমরায়। স্টাফ কোয়ার্টারের পাম্পে লাইনে দাঁড়াইতে গেলাম। দেখি বিশাল সিরিয়াল। কিছুক্ষণ পর পাম্প এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে খালি ট্যাংক নিয়েই এখন বাসার দিকে রওনা দিছি।’

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সদস্য মো. ওয়াহিদ খান বলেন, ‘সাধারণত স্টেশন পরিচালনার জন্য ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে অনেক জায়গায় মাত্র ৪ থেকে ৫ পিএসআই, এমনকি কোথাও ২ পিএসআইয়েরও নিচে নেমে গেছে।’

মিরপুরের একটি সিএনজি স্টেশনের ব্যবস্থাপক আমিনুল ইসলাম জানান, গভীর রাত ও ভোরে কিছুটা চাপ থাকলেও দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে।

ঢাকা জেলা সিএনজি চালক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় অনেক চালক দৈনিক আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছেন না।’

নারায়ণগঞ্জে ১৮ ফিলিং স্টেশনের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ

নারায়ণগঞ্জের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ অংশে ২০টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ১৮টিতেই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। মাত্র দুটি স্টেশনে সীমিত পরিসরে গ্যাস সরবরাহ থাকায় সেখানে শত শত গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকাল থেকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এমন চিত্র দেখা যায়। গ্যাসের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন চালকরা। ফিলিং স্টেশন-সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় গ্যাস গ্রিডে চাপ কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও সীমিত পরিমাণে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, আবার অনেক স্টেশন সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রেও চাপ তৈরি হয়েছে। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য অন্তত ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ প্রয়োজন হলেও একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সেই পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘তিতাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। দুর্ঘটনার আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, বর্তমানে তা কমে ১২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে বিভিন্ন খাতে সরবরাহ সীমিত করতে হচ্ছে।’

টার্মিনাল মেরামতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ আসছেন

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের অন্যতম ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা বাংলাদেশে আসছেন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ দেশে রয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ শুরু করলে দ্রুত টার্মিনালটি সচল করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অপারেশন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় অল্প সময়ের মধ্যেই টার্মিনালটি পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছে।’

তবে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, বিদেশি প্রকৌশলীরা পরিদর্শন শেষ করার পরই মেরামতকাজের সময়সীমা এবং গ্যাস সরবরাহ কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যাবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট দেশের এলএনজি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। মাত্র দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল থাকায় একটি বন্ধ হয়ে গেলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে।

বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যতে একটি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দিলেও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে না।’

উল্লেখ্য, গত সোমবার (২১ জুলাই) মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এর পর থেকেই জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। স্বাভাবিক সময়ে দুটি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  তীব্র গ্যাস   সংকট  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close