বন অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় অঞ্চল বন সংরক্ষক, ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষকের সমন্বয়হীনতা এবং সিদ্ধান্তহীনতায় গাজীপুর বন বিভাগে মাঠপর্যায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এতে ঢাকা বন বিভাগের গাজীপুর দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। চলছে বনভূমি দখলের মহোৎসব।
বন অধিদপ্তরে কেন্দ্রীয় অঞ্চল বন সংরক্ষকের (সিএফ) দায়িত্বে আছেন এ এস এম জহির উদ্দিন আকন। ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) দায়িত্বে আছেন মো. বশিরুল-আল-মামুন। সহকারী বন সংরক্ষকের (এসিএফ) দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ শামসুল আরেফীন। এ তিন কর্মকর্তার বদলির সময় হয়েছে। তারা ঝামেলা বা দায়-দায়িত্ব না নিয়ে নতুন কর্মস্থলের আশায় কালক্ষেপণ করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলা প্রবাদে যাকে বলে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি।’ এই তিন কর্মকর্তার সমন্বয়হীনতা ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় গাজীপুর বনে মাঠপর্যায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এ তিন কর্মকর্তার বদলির পর ওই তিন পদে আসন্ন কর্মকর্তারা অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় অঞ্চল বন সংরক্ষক ও ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তার পদায়ন আদেশে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবমূল্যায়ন এবং দুর্নীতিগ্রস্তদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠছে বারবার। এতে ঢাকা বন বিভাগের অধীন গাজীপুরে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গাজীপুরের বনাঞ্চল অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন মাঠপর্যায়ে কর্মরত অনেকেই।
সুযোগ পেয়ে বন দখলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে গাজীপুর বনের বেশ কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। কেন্দ্রীয় অঞ্চলে বেশ কয়েক বছর ধরে চাকরি করছেন এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বদলি নীতিমালা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বদলি নীতিমালা উপেক্ষা করে একই বিভাগে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দায়িত্ব দিয়ে রাখা হচ্ছে এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যাও কম নয়।
বিগত দিনে গাজীপুর থেকে বিভিন্ন অভিযোগে বদলি করা হয়েছিল এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনরায় গাজীপুরে বদলি করা হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পদায়ন। এতে গাজীপুর বন বিভাগ দুর্নীতিগ্রস্তদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সুযোগ পেয়ে গাজীপুর কালিয়াকৈর রেঞ্জের চন্দ্রা বিটে বন দখল উৎসব করছে ভূমিদস্যুরা। প্রতিরোধের পরিবর্তে বন দখলে সহযোগিতা করে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, গাজীপুর বনে মাঠপর্যায় কার্যক্রম তদারকি, সংগঠিত দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার ঘটনা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দায়িত্ব সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মদ শামসুল আরেফীনের। তবে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রয়েছে পাহাড়সম অভিযোগ। বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন করে তিন বছরের বেশি সময় ধরে এ কর্মকর্তাকে একই কর্মস্থলে রাখা হয়েছে। অধিকাংশ সরকারি কর্ম দিবসে তিনি মহাখালী বন ভবনে অবস্থান করছেন। এতে গাজীপুরে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বনের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তদন্তে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের রক্ষা করার অভিযোগ রয়েছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। আবার নির্দোষদের ফাঁসানোর অভিযোগও রয়েছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধান বলছে, কালিয়াকৈর রেঞ্জের চন্দ্রা বিটের চন্দ্রা মৌজার ৫৮, ১৪৫, ১৯৮, ১৭৮, ১৩১১, ১৪১৩, সিনাবহ মৌজার ৮৬, ৩১৩, পূর্ব চন্দ্রা মৌজার ২৫৩, ২৩, কালামপুর মৌজার ৪৬৬, মাটিকাটা মৌজার ১০৩, হরীতকীচালা মৌজার ২৫, গোবিন্দবাড়ী মৌজার ২৩ নম্বর সিএস দাগসহ জবরদখল হয়নি এমন কোনো বনের সিএস দাগ নেই। চন্দ্রা বিটে গত ১৯ মাসের বেশি সময় ধরে ১৩৮০ জন বন দখলকারীর নামের তালিকা ফাইলবন্দি হয়ে রয়েছে। অথচ দখলকারীদের বন থেকে উচ্ছেদ করতে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। তালিকায় এ বিশাল সংখ্যক জবরদখলকারী থাকার পরও চন্দ্রায় নিত্যদিন ঘুষের বিনিময়ে বন দখলের ঘটনা ঘটছে। গত ১৯ মাসে চন্দ্রা বিটে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মাত্র একটি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বিগত দিনে চন্দ্রা বিটের সিনাবহ, মাটিকাটা ও বাগাম্বর এলাকায় বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। অথচ নজরদারির অভাবে উদ্ধার হওয়া বনভূমি পুনরায় দখল হয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বন বিভাগে কর্মরত দুই রেঞ্জ কর্মকর্তা জানান, মাঠপর্যায় দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা হলে রেঞ্জ কর্মকর্তারা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন জমা দিয়ে থাকেন। কর্তৃপক্ষ যদি পরবর্তী ব্যবস্থা না নেয় তবে রেঞ্জ কর্মকর্তারা রেঞ্জের নিয়ন্ত্রণ হারায়। অন্তত দুই-একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেও দুর্নীতির দৃশ্যমান বিভাগীয় সাজা দরকার। এভাবে জবাবদিহিবিহীন, বিচারবিহীন সংস্কৃতি চলতে থাকলে ঢাকা বন বিভাগ গাজীপুরে নিয়ন্ত্রণ হারাবে। দুর্নীতিবাজ যারা ঘুরেফিরে গাজীপুর বনে বদলি হয়ে আসছে তারা পুনরায় দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। এসব দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতে প্রভাবশালী কারা তদবির করছে তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।
বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন, দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে কেন্দ্রীয় অঞ্চল বন সংরক্ষক এ.এস.এম জহির উদ্দিন আকনের সরকারি মুঠোফোন নাম্বারে বিভিন্ন সময় কল করলেও তিনি সাড়া দেননি।
আপনি মাঠপর্যায়ে সরেজমিন তদন্ত করে দুর্নীতি পেয়েছেন। পরবর্তী সময়ে আপনার লিখিত প্রতিবেদনে সেই কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত বা প্রত্যাহার অথবা বিভাগীয় মামলা হয়েছে এমন ঘটনা আছে কি না এ প্রশ্নের জবাবে সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মদ শামসুল আরেফীন বলেন, ‘এ বিষয়টি তিনি নথি দেখে বলতে পারবেন। আপাতত তার মনে পড়ছে না।’
আপনি বদলিসংক্রান্ত সভায় উপস্থিত থাকেন। যারা বছরের পর বছর ধরে ঢাকা বন বিভাগে চাকরি করছেন তাদের অন্য বিভাগে বদলির ব্যাপারে আপনি কখনো কথা বলেছেন কি না এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘পত্রিকায় (দৈনিক খোলা কাগজ) প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
অন্যদিকে কালিয়াকৈর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শহিদুল হাসান শাকিল জানান, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পত্রিকায় (দৈনিক খোলা কাগজ) প্রকাশিত সংবাদের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে বলেছেন। বিগত দিনে উচ্ছেদ করা স্থাপনাগুলো পুনরায় নির্মিত হয়েছে কি না সেটি দেখা হবে বলেও তিনি জানান।
বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন জানান, তিনি জবরদখল উদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে বন দখলে সহযোগিতা করার অভিযোগ সঠিক নয়।
কেকে/এলএ