সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-নারিতা ফ্লাইট ফের শুরু      পাউরুটিতে ক্যানসারের উপাদান ‘পটাশিয়াম ব্রোমেট’ ব্যবহার বন্ধে রিট      চট্টগ্রামে চাঁদা না পেয়ে আরেক ব্যবসায়ীর ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও বিস্ফোরণ      হামে আরও চার শিশুর মৃত্যু      গুলশানের বাসায় ফিরলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন      বঙ্গভবন ছাড়লেন সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন      সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের      
খোলাকাগজ স্পেশাল
সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় উপেক্ষিত প্রকৌশলীরা
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৮:৫৭ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে বিএনপির তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, “আই হ্যাভ এ প্ল্যান”। পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। এরপর থেকে তার সেই প্ল্যান অনুযায়ী রাষ্ট্রের কল্যাণ হয় এমন নানা কাজ করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে সেইসব উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল ভূমিকায় থাকার কথা থাকলেও উপেক্ষিত হচ্ছে দেশের প্রকৌশলী সমাজ।

বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে- রাষ্ট্রের সব জায়গায় প্রশাসন ক্যাডারের জয়জয়কার। হোক সেটা প্রশাসনিক পদ কিংবা কারিগরি- সব যেন প্রশাসন ক্যাডারের দখলে। অথচ দেশের বিভিন্ন কারিগরি সেক্টরের বিভিন্ন পদে প্রকৌশলীদের থাকার কথা। তাদের বিভিন্ন গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি হবে উন্নয়ন পরিকল্পনা। কিন্তু সেটা না হয়ে হচ্ছে উল্টোটা। 

দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে একসময় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রকৌশলীদের শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল। এখন সেটা নেই বললেই চলে। উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞ প্রকৌশলী বা প্রযুক্তিবিদদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কারণ, নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কারিগরি ঝুঁকি, প্রকল্পের বাস্তবতা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পর্কে তাদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান থাকে।

বাংলাদেশে সেই জায়গাটি ক্রমেই প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে যাচ্ছে। ফলে এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারও বাস্তবায়ন ঝুঁকির মুখে পরবে। এতে প্রকল্প দীর্ঘায়িত হবে এবং যথাসময়ে বাস্তবায়ন না হওয়াসহ নানাবিধ জটিলতা সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস অনুসন্ধান, তেল পরিশোধন, পাইপলাইন, এলএনজি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো জটিল কারিগরি বিষয় রয়েছে, সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পেশাদার প্রকৌশলীদের উপস্থিতি খুবই সীমিত। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নকে আরও কার্যকর করতে হলে টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে যোগ্য প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। না হলে প্রধানমন্ত্রীর (আই হ্যাভ এ প্ল্যান) স্বপ্ন বা পরিকল্পনা কোনোটাই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে না। কারণ, যে ব্যক্তি যেখানে দক্ষ বা উপযোগী, তাকে সেখানেই কাজে লাগাতে হবে।

এদিকে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ, কারিগরি খাতের নীতিনির্ধারণ, প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে পেশাদার প্রকৌশলীদের পরিবর্তে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রকৌশলীরা। তাদের অভিযোগ, সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও প্রকল্পে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব ক্রমেই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। 

কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদেও প্রশাসন ক্যাডার 

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক আদেশেও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে অধিকাংশই প্রশাসন ক্যাডারের বর্তমান বা সাবেক কর্মকর্তা। 

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র দুজন প্রকৌশলী ও প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। তারা হলেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম. তামিম, যিনি মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত হয়েছেন এবং বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন, যিনি এলপি গ্যাস লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তবে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত অধ্যাপক এম. শামসুল আলম প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা নন। তিনি একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত।  

অন্যদিকে পদ্মা অয়েল পিএলসি, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল), ওমেরা ফুয়েলস লিমিটেড, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস ব্লেন্ডার্স পিএলসি ও বাপেক্সের চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত ব্যক্তিরা প্রশাসন ক্যাডারের বর্তমান বা সাবেক কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ওয়াছিম জাব্বার, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ, বিপিসির চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মর্যাদার কর্মকর্তা মো. রেজানুর রহমান, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মান্নান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব এস. এম. ওয়ালিউর রহমান, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. রফিকুল আলম এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। 

এছাড়া গত ২৩ জুলাই পৃথক প্রজ্ঞাপনে আরও ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদ ছাড়া বাকি ১১টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে গ্রেড-২ পদমর্যাদায় এক বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন প্রশাসন ক্যাডারের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা থেকে জারি করা এ তথ্য জানানো হয়। 

সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রকৌশলীরা কোথায়?

প্রকৌশলীদের প্রশ্ন, যেখানে গ্যাস অনুসন্ধান, তেল পরিশোধন, পাইপলাইন, এলএনজি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো জটিল কারিগরি বিষয় রয়েছে, সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পেশাদার প্রকৌশলীদের উপস্থিতি এত সীমিত কেন? উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞ প্রকৌশলী বা প্রযুক্তিবিদদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কারণ, নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কারিগরি ঝুঁকি, প্রকল্পের বাস্তবতা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পর্কে তাদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান থাকে। বাংলাদেশে সেই জায়গাটি ক্রমেই প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় চলে যাচ্ছে।

প্রকৌশলীরা বলছেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নকে আরও কার্যকর করতে হলে টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে যোগ্য প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পেশাগত ভারসাম্যের অভাব একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে থাকতে পারে। 

তাদের মতে, বর্তমান মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিত্ব থাকলেও প্রকৌশলীদের কার্যত কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। উন্নয়নকেন্দ্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় এটি একটি বড় ঘাটতি বলে মনে করছেন তারা। কারণ বড় অবকাঠামো প্রকল্প, শিল্পায়ন, জ্বালানি, নগরায়ণ ও প্রযুক্তি খাতের নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রকৌশলগত বিশ্লেষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারিগরি প্রতিষ্ঠানেও আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা

বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোতে পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই কমে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন সরকারি বোর্ড ও নীতিনির্ধারণী কমিটিতে আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব প্রকৌশলী এএনএইচ আখতার হোসেন। 

তার মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, অতীতে সরকারি বিভিন্ন বোর্ড ও কমিটিতে সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞ প্রকৌশলী, স্থপতি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আইনজীবী এবং অন্যান্য পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা হতো। কিন্তু বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে পেশাজীবীদের পরিবর্তে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

আখতার হোসেনের অভিযোগ, আগে যেখানে জয়েন্ট সেক্রেটারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বোর্ড সদস্য হিসেবে রাখা হতো, সেখানে এখন ডেপুটি সেক্রেটারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিদের বোর্ডের নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাদের সংশ্লিষ্ট কারিগরি বিষয়ে কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান নেই।

তিনি বলেন, সরকারি বোর্ড গঠনের সময় এখন আর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বার অ্যাসোসিয়েশন কিংবা ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের মতো পেশাজীবী সংগঠনগুলোর কাছ থেকে কোনো মনোনয়ন চাওয়া হয় না। অথচ বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে অতীতে বোর্ড গঠনের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হয়েছিল, যেখানে পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল।

সাবেক এই সচিবের ভাষ্য, বোর্ডে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, সাংবাদিক কিংবা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা থাকলে সরকারি ক্রয়, নিয়োগ এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আরও কার্যকরভাবে যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয়। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগও কমে আসে। কিন্তু বর্তমানে এসব পেশাজীবীর অনুপস্থিতিতে তথ্য গোপন বা ম্যানিপুলেট করা সহজ হয়ে গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে একসময় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রকৌশলীদের শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে আটজন এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে চার থেকে পাঁচজন প্রকৌশলী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পরিষদেও একাধিক প্রকৌশলী ছিলেন, যা নীতিনির্ধারণে কারিগরি মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতির প্রতিফলন ছিল।

আখতার হোসেনের অভিযোগ, বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই কর্তৃত্ব ধরে রাখতে রাজনৈতিক সরকারকে অনেক সময় বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এর ফলে টেন্ডার, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সরকারি ব্যয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা আগের সরকারগুলোর সময় থেকে শুরু হয়ে এখনও অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিয়াউর রহমান প্রশাসনিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিসিএসের ২৮টি ক্যাডার গঠন করেছিলেন, যাতে সব ক্যাডারের কর্মকর্তারা মর্যাদা ও দায়িত্ব পালনের সমান সুযোগ পান। কিন্তু বর্তমানে সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং প্রশাসন ক্যাডারের বাইরে অন্যান্য পেশাজীবী ও ক্যাডারগুলোর মতামত ক্রমেই উপেক্ষিত হচ্ছে।

সাবেক এই সচিব বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে শুধু প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নয়, সংশ্লিষ্ট খাতের পেশাজীবীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে নীতিনির্ধারণে যুক্ত করতে হবে। অন্যথায় রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা 

অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (এ্যাব) কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব প্রকৌশলী শোয়েব বাশরী হাবলু বলেন, দেশের বিভিন্ন কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলীদের পরিবর্তে একটি আমলানির্ভর সংস্কৃতি গড়ে তোলা হচ্ছে। তার মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য কারিগরি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও প্রকৌশলীদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার যথাযথ প্রতিফলন ঘটছে না।

শোয়েব বাশরী হাবলু বলেন, কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আধিপত্য বাড়তে থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিও স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, যারা প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন এবং প্রযুক্তিগত বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন, কারিগরি নেতৃত্ব তাদের হাতেই থাকা উচিত। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং পুরো ব্যবস্থাই একসময় ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

প্রকৌশলী শোয়েব বাশরী হাবলুর মতে, কারিগরি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলীদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে এবং প্রকৌশলীদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে। 

তিনি দেশের স্বার্থে কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

ক্ষুব্ধ প্রকৌশলী সমাজ

ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইইবি) সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার শেখ আল আমিন বলেন, কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে প্রকৌশলীদের পরিবর্তে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থবিরতা চলে আসবে। বর্তমান সরকারের যে নির্বাচনী ইশতেহার, সেটি বাস্তবায়ন হবে না এবং প্রকল্প লিঙ্গারিং (দীর্ঘায়িত) হবে এবং এগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন হবে না, নানাবিধ জটিলতা সৃষ্টি হবে।

তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্তে প্রকৌশলী সমাজ ক্ষুব্ধ। বিষয়টি নিয়ে আইইবির পক্ষ থেকে সেমিনার ও কর্মশালার মাধ্যমে সরকারের কাছে তাদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। দেশ-বিদেশের প্রচলিত চর্চার আলোকে কারিগরি প্রতিষ্ঠানে পেশাদার প্রকৌশলীদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। 

শেখ আল আমিন জানান, এ বিষয়ে এখনো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা না হলেও বিভিন্ন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। মে মাসে আইইবির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া প্রায় ১৭ জন মন্ত্রী এবং ১০ জন প্রকৌশলী এমপির কাছেও এ বিষয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে।

তার ভাষ্য, বর্তমান সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রী নতুন এবং পেশাগতভাবে কারিগরি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রে সচিবদের পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। প্রকৌশলীদের সঙ্গে তাদের মতবিনিময়ের সুযোগও সীমিত। এছাড়া সরকারের উচ্চ পর্যায়ে প্রভাবশালী প্রকৌশলী মন্ত্রী না থাকায় এসব বিষয় যথাযথভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। 

তবে শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

কারিগরি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক নেতৃত্বে সংকট বাড়ছে

আইইবির সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খান মঞ্জুর মোরশেদ বলেন, কারিগরি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে এটি পুরোপুরি অন্যায়। এটা বাধাগ্রস্ত হবে এবং এটার উদাহরণ আছে। পেট্রোবাংলার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তারা কোনো কিছু কন্ট্রিবিউট না করে, তেল, গ্যাস নিয়ে বাংলাদেশ যে ঝুঁকিতে পড়ছে, এইটা দিস ইজ দ্য রিজন।

তিনি বলেন, আমাদের স্টেট কথা যেটা, টেকনিক্যাল পজিশন, সেখানে টোটালি ইঞ্জিনিয়ারদের প্রাধান্য দিতে হবে। এইটা হলো লজিক্যাল দাবি। যুক্তি সংগত দাবি। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান কন্টিনিউয়াসলি এডমিন ক্যাডার থেকেই দিতেছে। ফলে আজকে এই যে গ্যাসের সমস্যা, দিস ইজ দ্য রিজন। কারণ নন-টেকনিক্যাল লোককে টেকনিক্যাল জায়গায় বসাইলে কোনো কমিটমেন্ট নাই, তাদের কোনো নলেজ নাই। তাদের জন্য আজকে এই অবস্থা দেশে। সুতরাং টেকনিক্যাল যে পজিশনগুলি আছে, ক্ষেত্র আছে, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, সব জায়গায় কিন্তু নন-টেকনিক্যাল লোক বসায়ে রাখছে। সরকার উন্নয়নের যেটা কনটেস্ট হচ্ছে, যে ভিশন নিয়ে চলতেছে, এইটা বাধাগ্রস্ত হবে।

খান মঞ্জুর মোরশেদ বলেন, সরকারকে বিষয়টি বিভিন্নভাবে জানানো হয়েছে। সরকারে এসে সবসময় গুড ম্যান বলে যায়- ইঞ্জিনিয়ার গুড ম্যান এইটা ওইটা, কিন্তু দেশের প্রেক্ষাপটে এখন দেখা যাচ্ছে টোটাল যে ম্যানেজমেন্ট, মন্ত্রণালয় বলেন, সচিবালয় বলেন, যত জায়গায় বিভিন্ন বোর্ড আছে, কর্পোরেশন আছে- সব জায়গায় আমলা এবং নন-টেকনিক্যাল লোকের যে দৌরাত্ম্য, এইটা ম্যানেজমেন্ট চালাইতেছে। এইটা আমরা বলতেছি সরকারের কাছে, সরকার সেটার সঠিকভাবে এখনও রেসপন্স করতেছে না।

জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিলেন প্রকৌশলীরা

বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের আন্দোলনে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে দেশের প্রকৌশলীরা সাধারণ ছাত্র-জনতার পাশাপাশি রাজপথে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন দমনপীড়নের শিকার হন। আন্দোলনে বহু প্রকৌশলী সরাসরি অংশ অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন এবং নিয়ে আহত হয়েছেন এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে বুয়েট, চুয়েট, রুয়েট ও কুয়েটের শিক্ষার্থীরা মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। অনেক প্রকৌশলী আহত আন্দোলনকারীদের জন্য রক্ত সংগ্রহ, চিকিৎসা সহায়তা, অ্যাম্বুলেন্স সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তায় যুক্ত হন। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকৌশলীরা তথ্য যাচাই, নিরাপদ যোগাযোগ এবং অনলাইন সমন্বয়ে স্বেচ্ছাসেবী ভূমিকা পালন করেন। একই সময়ে বিভিন্ন প্রকৌশলী সংগঠন শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দেয় এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার আহ্বান জানায়।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রকৌশলী সমাজ   প্রশাসন ক্যাডার   কারিগরি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব   জ্বালানি খাত  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close