নীলফামারীতে উজানের ঢলে তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের চার গ্রাম। গত পাঁচদিনের অব্যাহত ভাঙনে এসব গ্রামের শতাধিক পরিবার হারিয়েছে ঘরবাড়ি। একের পর এক বিলীন হচ্ছে চাষের জমি, বসতভিটা। অসহায় পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে তিস্তার বাধসহ বিভিন্ন স্থানে। সরেজমিনে গেলে ক্ষতিগ্রস্তদের আহাজারি শোনা যায়।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ভাঙনকবলিত এলাকায় ফেলানো হচ্ছে ৪ হাজার ৫০০ জিওব্যাগ ও ৮০০ মিটার জিওটিউব। গত শনিবার থেকে কাজ শুরু করে রোববারের বিকেল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পুরো কাজ শেষ করতে আরও অন্তত ১০ দিন সময় লাগবে।
রোববার দুপুরে ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়ন পরিষদের নয় নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) নুর হোসেন জানান, গত পাঁচ দিন ধরে ইউনিয়নের ভেণ্ডাবাড়ি, পূর্ব ছাতুনামা, পশ্চিম ছাতুনামা ও কেল্লাপাড়া গ্রামে ভয়াবহ ভাঙন চলছে। অব্যাহত ভাঙনে গত বুধবার ২২টি, বৃহস্পতিবার ৬০টি ও শুক্রবার ১৫ পরিবারের বসতভিটা হারানোর তথ্য পাওয়া গেছে। গত শনিবার ও রোববারও ভেঙেছে, তাদের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। এতে গত পাঁচদিনে বসতভিটা হারানো পরিবারের সংখ্যা ১০০ পার হবে। ভাঙন ও জলমগ্নতায় এসব গ্রামের ৫০০ একর ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বাধসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ভাঙনরোধে শনিবার কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। রোববার কাজ অব্যাহত থাকায় স্বস্তি ফিরেছে এলাকার মানুষের মধ্যে।’
এলাকাবাসী জানায়, উজানের ঢলে গত বুধবার (২২ জুলাই) থেকে ওই চার গ্রামে প্রবল ভাঙন শুরু হয়। নদীর পানি কমলেও ভাঙন অব্যাহ আছে। পাঁচদিনে অব্যাহত ভাঙনে শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তাদের দাবি নদীর গতিপথ ডানতীরে সরে আসায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ভাঙনের শিকার হয়ে তিস্তার বাধে আশ্রিত ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের পূর্ব ছাতুনামা গ্রামের গৃহিনী আনোয়ারা বেগম (২৭)। বলেন, ‘নদী ভাঙতে ভাঙতে খেয়ে ফেলেছে আমাদের ভিটামাটি। কোনভাবে ঘরের চাল খুলে এনে এখানে আশ্রয় নিয়েছি। চুলা জ¦ালাতে পারছি না, বাচ্চাদের মুড়ি, চিড়া, বিস্কুট খাওয়াচ্ছি।’
ভেণ্ডাবাড়ি গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম (৫৬) বলেন, ‘প্রতি বছর নদীভাঙনে ভিটেমাটিসহ কৃষিজমি নদীতে হারাচ্ছি আমরা। তবে এবারে ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নদী ভাঙনে ১২ বিঘা কৃষি জমি হারিয়ে এখন আমি পথে বসেছি।’
কেল্লপাড়া গ্রামের কৃষক মমিনুর রহমান (৬৫) বলেন, ‘নদীতে বন্যা আসলেই ঘরবাড়ি, জমিজমা নদীতে চলে যাচ্ছে, এবারও তাই হয়েছে। কতবার নতুন করে ঘর করেছি, তার হিসাব নেই।’
ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী জানান, ‘ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণ ভাণ্ডার থেকে ১৩ টন চাল শুকনো পাওয়া গেছে। যা বন্যাকবলিত মানুষদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।’
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘তিস্তার যে ভাঙন দেখা দিয়েছে সেটি নদীর চর গ্রামে। সময়ে সময়ে নদীর পানির গতিপথ পরিবর্তন হয়। এর আগে উজানে বাইশপুকুর এলাকায় ভাঙনরোধে কিছু কাজ করায় এবার পানির গতি কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। ফলে ভাটিতে জেগেউঠা চরে পানি আঘাত করেছে। সেটি রক্ষায় ২৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ৫০০ জিওব্যাগ ৮০০ মিটার জিওটিউব ফেলানো হচ্ছে। শনিবার কাজ শুরু করে আজ রোববার দিনব্যাপী চলেছে। এতে করে ভাঙনরোধের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। এখন সেটিকে টিকসই করার জন্য আরও অন্তত ১০দিন কাজ চলবে।’
কেকে/এমএ