মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬,
৩ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী      ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা      র‌্যাব বিলুপ্ত করে ‘এসআরবি’ গঠনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন      বদলাচ্ছে অর্থবছরের সময়কাল      এবার ওমানকে বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের      ২৭৭ কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি      মানবতাবিরোধী অপরাধ : ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ সাত নেতার রায় যে কোনো দিন      
খোলাকাগজ স্পেশাল
দ্য আইরিশ টাইমসের প্রতিবেদন
ইয়াবার ভয়াবহ থাবায় বাংলাদেশের তরুণরা
খোলা কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ৯:১০ এএম আপডেট: ২৯.০৭.২০২৬ ৯:১৫ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

‘মেটালফ্রিক’ একসময় প্রতিদিন তার পোষা পাখির সঙ্গে সময় কাটাতেন। তিনি পাখির গায়ে হাত বুলিয়ে দিতেন, তার খাঁচা পরিষ্কার করতেন এবং তাকে ওড়ার জন্য ছেড়ে দিতেন। ‘এখন আর আমি এসব করতে পারি না। কে এসবের পরোয়া করে?’ ঢাকায় নিজের অগোছালো শোবার ঘরে শুয়ে কথাগুলো বলছিলেন তিনি। চল্লিশের কোঠার এই ব্যক্তি তার দেওয়া ছদ্মনাম ব্যবহার করতে বলেন। তিনি ইয়াবার মারাত্মক আসক্তিতে ভুগছেন। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এই মাদক বাংলাদেশে অগণিত জীবন ধ্বংস করছে।

থাই ভাষায় ‘ইয়াবা’ শব্দের অর্থ ‘পাগল করা ওষুধ’। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ এই মাদকে আসক্ত এবং এই সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

মেটালফ্রিক বলেন, ইয়াবার প্রভাব চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা থাকে। ইয়াবা সেবন করলে টানা তিন দিন জেগে থাকার পর চরম ক্লান্তি নিয়ে তিনি একসঙ্গে ১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ঘুমান।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের প্রায় ৫ শতাংশ মাদকে আসক্ত। আর ‘নতুন সিন্থেটিক ও আধা-সিন্থেটিক মাদকের বিস্তার’ এ সমস্যাকে আরও তীব্র করছে। চলতি মাসে বাংলাদেশের সংসদে মাদকসংক্রান্ত কিছু অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিল অনুমোদন করা হয়েছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘আমরা যদি মাদকের ব্যবহার কমাতে চাই, তাহলে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি করতে হবে।’ ঢাকার নিরাময় পুনর্বাসন কেন্দ্রেও কাজ করেন আরিফুজ্জামান। ওই কেন্দ্রের অভ্যর্থনা কক্ষের পেছনের দেয়ালে লেখা আছে, ‘যেখানে নিরাময় শুরু, সেখান থেকেই জীবন।’

আরিফুজ্জামান বলেন, ইয়াবায় আসক্তি এখন ‘খুবই সাধারণ’ বিষয়। তবে অনেক ব্যবহারকারী অন্যান্য মাদকও গ্রহণ করেন। এর মধ্যে বুপ্রেনোরফিন ইনজেকশন, হেরোইন ও ওমোরফোন বড়ি থাকতে পারে। প্রায় প্রতিটি মাদকের ব্যবহারই বাড়ছে। তবে ইয়াবার ব্যবহার ‘উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে’।

আরিফুজ্জামান বলেন, আসক্ত কিছু ব্যক্তি মাদকের খরচ জোগানোর অন্য কোনো উপায় না পেয়ে নিজেরাই কারবারি (ডিলার) হয়ে যান। আবার অনেকে বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত মানসিক ব্যাধি কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীনতার (সাইকোসিস) মতো সমস্যায় ভুগছিলেন, যা থেকে মুক্তি পেতে তারা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

আরিফুজ্জামান আরও বলেন, কোনো মাদক সহজে পাওয়া গেলে সেটাই বেশি সংখ্যক মানুষ সেবন করে। মাদক ও অপরাধবিষয়ক জাতিসংঘের দপ্তরের (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ইয়াবা সেবন ‘তরুণদের সংস্কৃতির’ অংশ হয়ে ওঠার আগে এশিয়ার কিছু অংশে এটি ট্রাকচালকদের মতো পেশাজীবীরা সেবন করতেন। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১২ লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়েছিল বলে ইউএনওডিসি জানিয়েছে।

থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের সীমান্ত যেখানে মিলেছে, তা ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, এটি সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে সক্রিয় এলাকাগুলোর একটি। ইউএনওডিসি বলছে, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন (সাধারণত ‘মেথ’ নামে পরিচিত) জব্দ করা হয়েছে। এটি ২০২৩ সালের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। তবে সম্ভবত আরও অনেক বেশি মাদক বাজারে বিক্রির জন্য চলে যাচ্ছে। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে আসা ইয়াবার প্রধান উৎপাদনকারী দেশ হলো মিয়ানমার।

মেটালফ্রিক বলেন, এই বড়ির কারণে তিনি অনেক বন্ধুকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি নিয়মিত সেবন করলে স্ট্রোক হতে পারে। অনেকে দাঁত হারায় বা তাদের ‘খিঁচুনি’ হতে শুরু করে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে আফিম বা হেরোইন পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। ইয়াবা অন্য সব মাদককে পুরোপুরি হটিয়ে দিয়েছে। ঢাকার রাস্তায় তরুণদের সহজেই এই বড়ির প্যাকেট বিক্রি করতে দেখা যায়। মোহাম্মদপুর এলাকায় দেখা যায়, অল্প বয়সী ছেলেরা বড়ির ছোট প্যাকেট উঁচু করে ধরে আছে, আর রিকশাচালকেরা হাত বাড়িয়ে সেটি নিয়ে নিচ্ছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়, যার জেরে শেখ হাসিনার পতন ঘটে। পরে ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়লাভ করে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকেও এ কথা বলা হয়েছে। দেশের বহু তরুণ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন।

এসব উত্থান-পতন ব্যক্তিগত জীবনেও জটিলতা তৈরি করে।

মেটালফ্রিক বলেন, ইয়াবা মানুষকে ‘মিথ্যা আত্মবিশ্বাস’ দেয়। এতে অনেকে ‘অদ্ভুত সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে’ বিশ্বাস করতে শুরু করে। তার কথাবার্তা এলোমেলো হয়ে যায়। কথা বলতে বলতেই তিনি কিম জং-উন, চীনের উইঘুর, নি-ক্যাপ, ভেনেজুয়েলা, অং সান সু চি এবং ভ্লাদিমির পুতিনকে নিয়ে নিজের ভাবনার কথা বলতে শুরু করেন। মেটালফ্রিক বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সব কিছুকেই প্রভাবিত করে—সন্ত্রাসবাদ, অপরাধ ও মাদকাসক্তি। তার মতে, বিত্তবান মানুষের হাতেই মাদকাসক্ত হওয়ার মতো যথেষ্ট সময় থাকে। ‘আমি সুবিধাপ্রাপ্ত... আমার নিজের একটা ঘর আছে। আমি চাইলে সেখানে শুয়ে থাকতে পারি। আমাকে আগামীকালের চিন্তা করতে হয় না—কে আমাকে খাওয়াবে, কে আমার পরিবারকে খাওয়াবে।’

তিনি মাদকের প্রভাব নিয়ে খুব চিন্তিত। তিনি বলেন, কীভাবে ইয়াবা সেবনকারীরা ‘দুই বছরও টিকতে পারে না’। কারণ, তারা ঘুমায় না। ‘এটি ধীরে ধীরে বিষপ্রয়োগ, এটি একটি নিখুঁত পরিকল্পনা।’

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ইয়াবা   ভয়াবহ থাবা   বাংলাদেশ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close