বাংলাদেশে ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভারের জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ অসংখ্য অসংক্রামক রোগের পেছনে ভেজাল খাদ্য দায়ী। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও রাসায়নিক দূষণ এবং অনিরাপদ খাদ্যকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করছেন। ফল পাকাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক, মাছ-মাংসে নিষিদ্ধ ওষুধ, দুধে ভেজাল, মসলায় রং, বেকারি পণ্যে নিম্নমানের উপাদান—এসব নিয়ে প্রায়ই আলোচনায় আসে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের হাতে সবচেয়ে কার্যকরভাবে থাকা উচিত?
স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের একটি বড় অংশ মনে করেন, জনস্বাস্থ্য রক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থাকা উচিত। তাদের দাবি, নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হলে বিদ্যমান প্রশিক্ষিত জনবল ব্যবহার করে আরও কার্যকরভাবে কাজ করা সম্ভব হবে।
খাদ্য তদারকিতে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের ভূমিকা
ঔপনিবেশিক আমল থেকে খাদ্য ভেজাল নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ১৮৮৪ সালের বেঙ্গল মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট থেকে শুরু করে বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ, ১৯৫৯ এবং পরবর্তী বিধিমালাগুলোতে খাদ্য পরিদর্শন, নমুনা সংগ্রহ, মামলা পরিচালনা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির দায়িত্বে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন এই জনবল দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য নিরাপত্তা, তামাক নিয়ন্ত্রণ, মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্য আইন, আয়োডিন আইন এবং ভোক্তা অধিকারসংক্রান্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমে অংশ নিয়ে আসছে। তাদের ভাষ্য, নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ প্রণয়নের পর আইনগত কাঠামোয় তাদের ঐতিহাসিক অবস্থান স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় একটি দক্ষ জনবল কাঠামো কার্যত প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩: দূরত্ব কোথায়?
২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল খাদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আধুনিক ও সমন্বিত করা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজ করা স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের অভিযোগ, নতুন ব্যবস্থায় তাদের ভূমিকা অনির্দিষ্ট হয়ে যায়। পরে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অনেককে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তা স্থায়ী কাঠামোতে রূপ পায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—যারা দশকের পর দশক খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের বাইরে রেখে নতুন কাঠামো কতটা কার্যকর হতে পারে?
অনিরাপদ খাদ্যের বোঝা কার কাঁধে?
একজন মানুষ যখন ভেজাল বা দূষিত খাদ্য গ্রহণ করেন, তখন তার প্রভাব পড়ে সরাসরি মানবদেহে। খাদ্যজনিত রোগের চিকিৎসা, রোগতত্ত্ব বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিরূপণ এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা—সবই স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্ব। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। তাদের যুক্তি হলো—খাদ্যের কারণে অসুস্থ হলে রোগীরা হাসপাতালে যান। রোগতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য বিভাগ। খাদ্যজনিত রোগের নজরদারি করে স্বাস্থ্য বিভাগ। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করে স্বাস্থ্য বিভাগ। চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। সেক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগের সরাসরি সম্পৃক্ততা শক্তিশালী করা যৌক্তিক হতে পারে।
বাড়ছে সমন্বয়ের আলোচনা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বয়ের আলোচনা বাড়ছে। তবে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের একটি অংশ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, যদি জনস্বাস্থ্যভিত্তিক খাদ্য নিরাপত্তা কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে উৎপাদনমুখী কোনো বিভাগের অধীনে চলে যায়, তাহলে কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।
১. উৎপাদন বনাম জনস্বাস্থ্য: কৃষি বিভাগের প্রধান লক্ষ্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। অন্যদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের লক্ষ্য মানুষের রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা। একটি বিভাগ উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেয়, অন্যটি ভোক্তার শরীরে প্রভাব নিয়ে কাজ করে। সমালোচকদের মতে, দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
২. হাসপাতালভিত্তিক নজরদারির অভাব: স্বাস্থ্য বিভাগের রয়েছে হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সিভিল সার্জন অফিস এবং জনস্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। খাদ্যজনিত রোগের তথ্য সরাসরি এ নেটওয়ার্কে আসে। কৃষি বিভাগের এমন স্বাস্থ্য-নজরদারি অবকাঠামো নেই।
৩. খাদ্য বিষক্রিয়া তদন্তে সীমাবদ্ধতা: কোনো এলাকায় খাদ্যে বিষক্রিয়া, রাসায়নিক দূষণ বা গণঅসুস্থতার ঘটনা ঘটলে স্বাস্থ্য বিভাগ চিকিৎসা ও তদন্ত—দুটোর সঙ্গেই সম্পৃক্ত থাকে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্ত ও প্রতিরোধ একই ছাতার নিচে থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়।
৪. বিদ্যমান প্রশিক্ষিত জনবলের ব্যবহার: রাষ্ট্র ইতোমধ্যে বহু বছর ধরে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের প্রশিক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। এই জনবলকে পাশ কাটিয়ে নতুন কাঠামো গড়ে তুললে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রশ্নও সামনে আসে।
কৃষি বিভাগ পারলে স্বাস্থ্য বিভাগ পারবে না কেন? এটি স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন।
তাদের যুক্তি—খাদ্য নিরাপত্তা জনস্বাস্থ্যের অংশ। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য বিভাগের স্থায়ী অবকাঠামো রয়েছে। ইউনিয়ন থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। খাদ্য নমুনা সংগ্রহ, জনসচেতনতা ও আইন প্রয়োগে অভিজ্ঞ জনবল বিদ্যমান। তামাক নিয়ন্ত্রণ, ভোক্তা অধিকার, মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্য আইন বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই তাদের মতে, কৃষি বা অন্য কোনো বিভাগ যদি খাদ্য নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে স্বাস্থ্য বিভাগের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
তবে বিপরীত মতও রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আধুনিক খাদ্য নিরাপত্তা একটি বহুমাত্রিক বিষয়, যেখানে কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, শিল্প, স্থানীয় সরকার, ভোক্তা অধিকার এবং স্বাস্থ্য—সব বিভাগের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা জানান, নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ বাস্তবায়নের জন্য তাদের কোনো আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় না। তথাপি নিজ দায়িত্ব ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুভাবে প্রতিপালন করে আসছেন। তারা নিয়মিত হাটবাজার পরিদর্শন, অনিরাপদ খাদ্য জব্দ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। ব্যবসায়ী, ভোক্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ জনসমাগমস্থলে এ বিষয়ে সচেতন করছেন। কিন্তু এর জন্য কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয় না।
জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত কবে?
বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখন শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। ভেজাল খাদ্যের কারণে যদি মানুষ অসুস্থ হয়, কর্মক্ষমতা হারায় এবং চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে, তাহলে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের দাবি, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে নিরাপদ খাদ্য আইনকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে তাদের স্থায়ীভাবে নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হোক। অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের সামনে প্রশ্ন—খাদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থাকে কি একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কেন্দ্রীভূত করা হবে, নাকি বহুমাত্রিক সমন্বিত কাঠামো বজায় রাখা হবে?
এই বিতর্কের চূড়ান্ত উত্তর যাই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট—নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা না গেলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই।
কেকে/এলএ