পার্বত্য জেলা বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মকভাবে বেড়েছে। গত ১৫ দিনে রুমা উপজেলার লেতং খুমী পাড়াসহ বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অনেক রোগী ও তাদের স্বজন অর্থাভাবে এবং দুর্গমতার কারণে নিজ গ্রামে গ্রাম্য চিকিৎসা করিয়ে অবস্থার অবনতি ঘটিয়েছেন। বহু শিশু এখন বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, জেলায় হাম রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেলেও পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত রয়েছে এবং চিকিৎসকেরা নিয়মিত রোগীদের সেবা দিচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য জেলা বান্দরবানের রুমা, থানচি ও আলীকদম উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা হঠাৎ করে হাম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। দুর্গমতা ও অর্থাভাবে অনেক রোগী নিজ নিজ এলাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা নিলেও অবস্থার অবনতি হওয়ায় অনেককে এখন জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বান্দরবান সদর হাসপাতালের হাম রোগের ওয়ার্ডে ভর্তি রুমা উপজেলার ফাইননপাড়া থেকে আসা পারিং ম্রো নামে একজন অভিভাবক বলেন, ‘সাত বছর বয়সি আমার মেয়ের কয়েক দিন ধরে গলা, পেট ও মুখে ব্যথা শুরু হয়। রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে এনে ভর্তি করেছি।’
বান্দরবানের সমাজকর্মী রাজেশ দাশ বলেন, বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আক্রান্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা, ওষুধ সরবরাহ এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
গত এক সপ্তাহে বান্দরবানের রুমা উপজেলার চেমাখাল, শৈরাতং, লেতংপাড়া ও পাইন্দুখাল, থানচি উপজেলার তিন্দু এলাকা এবং রোয়াংছড়ির খামতাং পাড়ায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ম্রো, খুমী, মার্মা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা ও খিয়াং সম্প্রদায়ের শিশুরা হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত হয়েছে। হামে আক্রান্ত হয়ে অনেকের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে হাসপাতালে আনার আগেই কয়েকজন শিশুর পাড়াতেই মৃত্যু হয়েছে।
রুমার দুর্গম এলাকায় ১৫ দিনে ৮ শিশুর মৃত্যু
বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম অঞ্চল লেতং খুমী পাড়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ আরও এক শিশুকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ দিনে রুমা উপজেলায় হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আটজনে। বর্তমানে একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ জন এবং বান্দরবান জেলা সদর হাসপাতালে ৩৬ জনসহ মোট ৪১ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন বান্দরবানের জেলা সিভিল সার্জন ও সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শাহিন হোসাইন চৌধুরী।
তিনি জানান, গত শনিবার (২৫ জুলাই) সকালে স্থানীয়দের মাধ্যমে লেতং খুমী পাড়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই দুজন স্বাস্থ্যকর্মী ও একজন ভ্যাকসিনেটরকে সেখানে পাঠানো হয়। তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে সম্প্রতি মারা যাওয়া শিশুদের শরীরে হামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপসর্গ দেখতে পান। তবে আগে মারা যাওয়া শিশুদের সরাসরি পরীক্ষা করার সুযোগ না থাকায় মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা অং সাই খুমী জানান, শনিবার ভোরে নয় বছর বয়সি পলিএং খুমী ও ছয় বছর বয়সি নাতয়ই খুমীর মৃত্যু হয়। এ দুজনসহ গত ১৫ দিনে রুমা উপজেলায় একই ধরনের উপসর্গে মোট আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল হাসান জানান, গত ৩ জুন থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৯ জন শিশু রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বান্দরবান জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছিল। তিনি আরও জানান, যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তারা বাড়িতে অথবা হাসপাতালে আনার পথে মারা গেছে। দুর্গম এলাকায় হামের উপসর্গের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় সেখানে স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ টিম পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় রোগীদের হাসপাতালে আনা এবং শিশুদের টিকাদানে উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রম চলছে।
বান্দরবানের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত জেলায় হাম রোগে ১ হাজার ৪০০ জন আক্রান্ত হয়েছে।
বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. অতনু চৌধুরী জানান, বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে সদর হাসপাতালে ৩৬ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। তিনি আরও জানান, হাম রোগের প্রতিষেধক হিসেবে সরকারিভাবে প্রদান করা টিকা গ্রামপর্যায়ে অনেক শিশু গ্রহণ করেনি। পারিবারিক অজ্ঞতা, অসচেতনতা এবং পার্বত্য এলাকার দুর্গমতার কারণে পাহাড়ে হামের প্রাদুর্ভাব হঠাৎ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে।
বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী জানান, ‘আমরা সাতটি উপজেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের হাম রোগীদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে নির্দেশনা দিয়েছি। হাম প্রতিরোধে আমাদের পর্যাপ্ত ওষুধ রয়েছে এবং চিকিৎসকেরা নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘হামের প্রতিষেধক টিকা অনেক পাড়ায় না নেওয়ার কারণে হঠাৎ করে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। তবে আমরা বিভিন্ন পাড়ায় আবারও জরিপ করে ঘরে ঘরে গিয়ে শিশুদের হামের টিকা প্রদান কার্যক্রম চালিয়ে যাব।’
কেকে/এলএ