সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্নভাবে আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে মারাত্মক ক্ষতিকর পদার্থ মাইক্রোপ্লাস্টিক। আপনার আমার নিত্য ব্যবহার্য জিনিস থেকে শুরু করে খাবারে পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে এ পদার্থ। সম্প্রতি বেশ আলোচনায় রয়েছে এর স্বাস্থ্যঝুঁকি।
৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ক্ষুদ্র যেকোন প্লাস্টিক কণা হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক। এর আকার তিলের দানা থেকেও ছোট হতে পারে।
উৎস
মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রধান উৎস হলো বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকজাত পণ্য ও বর্জ্য। প্লাস্টিক বোতল, প্যাকেট, একবার ব্যবহারযোগ্য কাপ-প্লেট, স্ট্র ও খাদ্য মোড়ক সময়ের সঙ্গে ক্ষয় হয়ে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণায় পরিণত হয়। এছাড়া পলিয়েস্টার, নাইলন ও অ্যাক্রিলিকের মতো সিনথেটিক কাপড় ধোয়ার সময় অসংখ্য মাইক্রোফাইবার পানিতে মিশে যায়, যা মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের একটি বড় উৎস।
এ ছাড়া যানবাহনের টায়ারের ক্ষয়, ভবন ও সড়কের রং, শিল্পকারখানার প্লাস্টিক বর্জ্য, কিছু প্রসাধনী ও টুথপেস্টে ব্যবহৃত মাইক্রোবিড এবং সমুদ্রে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক ও মাছ ধরার জাল থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হয়। এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বাতাস, পানি ও মাটির মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্য, পানীয় ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে এসব কণা সহজে নষ্ট হয় না। বরং নদী, সমুদ্র, মাটি ও বাতাসে বছরের পর বছর থেকে যায় এবং খাদ্যচক্রের অংশ হয়ে ওঠে।
ক্ষতিকর দিক
মাইক্রোপ্লাস্টিক আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর সম্ভাব্য ক্ষতির পরিধি বেশ বড়। প্রতিদিন খাবার, পানীয় ও বাতাসের মাধ্যমে অজান্তেই এসব প্লাস্টিক কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় রক্ত, ফুসফুস, যকৃত এমনকি প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। যদিও এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান, তবু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি, কোষের ক্ষতি, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে। পাশাপাশি হৃদ্রোগ, প্রজনন সমস্যা ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
শুধু মানুষের শরীরই নয়, মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব পড়ছে পুরো পরিবেশে। নদী-সমুদ্রের মাছ, কচ্ছপ, পাখিসহ নানা প্রাণী খাবার ভেবে এসব কণা গিলে ফেলছে, যার ফলে তাদের বৃদ্ধি, প্রজনন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাইক্রোপ্লাস্টিক সহজে পচে বা নষ্ট হয় না। তাই একবার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে এটি বছরের পর বছর থেকে যায় এবং খাদ্যশৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে প্রবেশ করে মানুষসহ সব জীবের জন্য নীরব কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করে।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতি কমাতে করণীয়
১. একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাঁচ, স্টেইনলেস স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করুন।
২. প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার রাখা বা মাইক্রোওয়েভে গরম করা এড়িয়ে চলুন।
৩. বোতলজাত পানির বদলে নিরাপদ ফিল্টার করা বা বিশুদ্ধ পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৪. অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও প্লাস্টিক মোড়কে সংরক্ষিত খাবারের পরিবর্তে তাজা খাবার বেশি খান।
৫. পলিয়েস্টার, নাইলন বা অ্যাক্রিলিকের মতো সিনথেটিক কাপড়ের পরিবর্তে সুতি, লিনেন বা অন্যান্য প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক ব্যবহারে গুরুত্ব দিন।
৬. প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ, বোতল ও খাদ্য সংরক্ষণের পাত্র ব্যবহার করুন।
৭. প্লাস্টিক বর্জ্য যত্রতত্র না ফেলে নির্ধারিত স্থানে ফেলুন এবং পুনর্ব্যবহারে উৎসাহিত করুন।
৮. পরিবেশ দূষণ রোধে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ান।
কেকে/সাশ