একসময় কোনো প্রসাধনীর গায়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা থাকলে অনেক ক্রেতাই হয়তো একটু দ্বিধায় পড়তেন। দেশি পণ্য বলে নয়, বরং ত্বক আর চুলের যত্নের বিষয়টা যেহেতু বেশ স্পর্শকাতর তাই কোন পণ্যটি ব্যবহার করছি, তাতে কী আছে, আদৌ ভরসা করা যায় কি না, এসব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে সেই ভরসার জায়গাটা ছিল মূলত বিদেশি পণ্যের দখলে।
কোরিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড কিংবা ইউরোপের কোনো দেশ থেকে আসা পণ্য মানেই যেন বেশি নিরাপদ, বেশি ভালো, এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল গত দুই দশকে। বিপরীতে, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ অনেকের কাছে ছিল সাশ্রয়ী মূল্যের বিকল্প হিসেবে।
এই ধারণা অবশ্য হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। দেশের পার্সোনাল কেয়ার বাজারের একটা বড় সময় কেটেছে মূলত দামের প্রতিযোগিতায়। কোন উপাদান দিয়ে পণ্যটি তৈরি, কীভাবে তৈরি, কীভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে এসব তথ্য ক্রেতার সামনে সবসময় পরিষ্কার ছিল না। তার ওপর নকল আর অননুমোদিত পণ্যের দাপট তো ছিলই। ফলে পরিচিত বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যকেই অনেকের কাছে সহজ ও নিরাপদ মনে হয়েছে।
তবে সেই জায়গাটা এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। একটি বিউটি শপে গিয়ে স্থানীয় ব্র্যান্ডের ক্লেনজার, সানস্ক্রিন, হেয়ার অয়েল বা সিরাম দেখলে ক্রেতারা আগের মতো শুধু ‘দেশি’ বলে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন না। একই শেলফে থাকা বিদেশি পণ্যের সঙ্গে পাশাপাশি রেখে দেখছেন। শুধু সস্তা বিকল্প হিসেবে নয়, বরং নিজেদের গুণ ও কার্যকারিতার ভিত্তিতেই এসব পণ্য ক্রেতাদের নজর কাড়ছে।
এখন ক্রেতারা শুধু একটি ব্র্যান্ডের পরিচিতির ওপর নির্ভর করছেন না। বরং পণ্যে থাকা উপাদানগুলো, তার কার্যকারিতা সম্পর্কে বলা কথাগুলো এবং বাস্তবে তা কতটা কার্যকর, এই সব বিষয়েই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই একসময় অপরিচিত মনে হওয়া উপাদানের নাম ও পণ্যের বিভিন্ন দাবি এখন দৈনন্দিন সৌন্দর্যচর্চার আলোচনারই অংশ হয়ে উঠেছে।
সাজগোজ লিমিটেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও চিফ কনটেন্ট অফিসার সিনথিয়া শারমিন ইসলাম সাজগোজের কনটেন্ট ও কমিউনিটির মাধ্যমে এই পরিবর্তনটি খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
তিনি বলেন, “আমরা যখন শুরু করি, তখন কমেন্ট সেকশনের প্রায় প্রতিটি প্রশ্নই ছিল ‘পণ্যটি বিদেশ থেকে এসেছে, না দেশে তৈরি?’ এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন প্রশ্ন আসে, ‘এতে কত পার্সেন্ট নিয়াসিনামাইড আছে?’, ‘এটি কি ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়েছে?’, ‘ঢাকার আর্দ্র আবহাওয়ায়, তৈলাক্ত ত্বকে এটি কাজ করবে কি না?’ এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক , যদিও ব্র্যান্ডগুলোর জন্য এর উত্তর দেওয়াও কঠিন।”
ক্রেতাদের এই বদলে যাওয়া প্রশ্ন আসলে স্থানীয় সৌন্দর্যপণ্যের বাজারেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কোভিড-১৯’-এর সময় এবং পরবর্তী এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমদানি করা পণ্যের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের মানসম্মত পণ্য, উন্নত ফর্মুলেশন স্বচ্ছ উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় মাধ্যমে ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের আরও সুযোগ পায়।
এখন স্থানীয় বিউটি ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিযোগিতা শুধু দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্পষ্ট উপাদান তালিকা, তৃতীয় পক্ষের পরীক্ষা, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন, কিংবা পণ্য নিয়ে দাবি করা নির্ভরযোগ্য তথ্য ক্রেতাদের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে পণ্যটি কোন দেশের, তার চেয়ে সেটি বাস্তবে কতটা কার্যকর, সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
পণ্য সম্পর্কে জানার সুযোগও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিউটি কমিউনিটি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং ক্রেতাদের রিভিউয়ের মাধ্যমে ব্র্যান্ডের প্রচারণার বাইরেও পণ্য ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানা যাচ্ছে। এতে কেনার আগে একটি পণ্য নিয়ে যাচাই-বাছাই করার সুযোগও বেড়েছে। ফলে স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পণ্যের কার্যকারিতাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অফার বা ছাড় একজন ক্রেতাকে প্রথমবার পণ্যটি কিনতে আগ্রহী করতে পারে। কিন্তু সেই ক্রেতাকে আবার ফিরিয়ে আনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
সাজগোজ লিমিটেডের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারহানা এ. প্রীতি বিষয়টি সহজভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন, “অফার দিলে যে কেউই একবার হলেও একটি পণ্য ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠবে। স্থানীয় বাজার হোক বা আমদানিকৃত পণ্যের ব্র্যান্ড, দুই ক্ষেত্রে বাজারব্যবস্থা এভাবেই কাজ করে। কিন্তু শুধু অফার দিয়ে একজন ক্রেতাকে আবার ফিরিয়ে আনা যায় না। স্থানীয় স্কিনকেয়ার ও হেয়ারকেয়ারের জায়গায় এই পরিবর্তনটি ঠিক এভাবেই এসেছে।”
সব মিলিয়ে, বাজারের প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু সাশ্রয়ী দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিউটি শেলফে জায়গা করে নিতে স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোকে তাদের পণ্যের মান, কার্যকারিতা এবং ধারাবাহিকতা প্রমাণ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশে সৌন্দর্যপণ্য কেনার ক্ষেত্রে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা আছে কি না, সেটিই এখন আর ক্রেতার একমাত্র বিবেচনা নয়। পণ্যের গায়ে থাকা লেবেলের বাইরে গিয়ে ক্রেতারা এখন নিজের মতো করে খতিয়ে দেখছেন পণ্যের ভালো-মন্দ।
কেকে/এমএ