বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬,
৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: কলকাতার হোটেলে অগ্নিকাণ্ড, ৬ জনের পরিচয় শনাক্ত      ছয় ব্যাংকে আটকে আছে ডেসকোর ২৫০ কোটি টাকা      পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়াবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া      এনবিআরের পাঁচ অঙ্গীকার      কলকাতায় আগুনে ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু      তিন জেলার ডিসি প্রত্যাহার      রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করব: মির্জা ফখরুল      
খোলাকাগজ স্পেশাল
প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্টি, সরকারে আস্থা কম
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১১ এএম আপডেট: ২০.০৮.২০২৬ ১০:১৬ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে একদিকে যেমন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শক্তিশালী আস্থা রয়েছে, অন্যদিকে সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রম ও দেশের গতিপথ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করছেন। তবে সরকারের সামগ্রিক কাজে সন্তুষ্ট ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ। আর দেশ সঠিক পথে চলছে বলে মনে করেন ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং কর্মসংস্থানের সংকট জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে সরকারের সামগ্রিক কর্মদক্ষতায় রূপান্তর করাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
 
ডপলার অপিনিয়ন রিসার্চ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং সার্ভে ২০২৬’ শীর্ষক জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডা ভবনের মাল্টিপারপাস হলে এক অনুষ্ঠানে এ জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সরকারের ১৮০ দিনের কাজ নিয়ে জনমত যাচাইয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচালিত এ জরিপে ১০ হাজার ৪১৩ জনের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হয়। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৪৪৩ জন জরিপের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। উত্তরদাতারা দেশের ৬৪ জেলা এবং ৪৮৯টি ওয়ার্ড ও গ্রামের প্রতিনিধিত্ব করেন। 

প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট ৬৬.৩ শতাংশ

জরিপের তথ্যানুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করছেন। বিপরীতে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ বলেছেন, তিনি ভালো করছেন না। আর ১২ দশমিক ১ শতাংশ কোনো মতামত দেননি। 

বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা ও আয়ভেদে প্রধানমন্ত্রীর কাজের মূল্যায়নে বড় ধরনের পার্থক্য নেই। বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে সন্তুষ্টির হার ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটিতেই প্রধানমন্ত্রীর কাজের প্রতি সন্তুষ্টির হার ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ বা তার বেশি।

দলীয় সমর্থনের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলকভাবে বেশি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করছেন বলে মনে করেন।

অন্যদিকে সরকারের সামগ্রিক কাজ ভালো হয়েছে বলে মনে করেন ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ। সরকারের কাজ খারাপ হয়েছে বলে মত দিয়েছেন ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ দলীয় সমর্থকগোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও একই ধরনের একটি প্রবণতা দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর মূল্যায়ন সরকারের সামগ্রিক মূল্যায়নের চেয়ে ভালো।

দেশ সঠিক পথে চলছে, মনে করেন ৪৮.৬ শতাংশ

দেশ সঠিক পথে চলছে কি না, এ প্রশ্নে মানুষের মধ্যে বিভাজন সবচেয়ে বেশি। জরিপে ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, দেশ সঠিক পথে চলছে। বিপরীতে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন দেশ ভুল পথে চলছে। আর ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো উত্তর দেননি।

বিএনপির সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন দেশ সঠিক পথে আছে। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে এ হার মাত্র ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ। বিভাগভেদে ময়মনসিংহে সবচেয়ে বেশি, ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দেশ সঠিক পথে চলছে বলে মনে করেছেন। বিপরীতে খুলনায় এ হার ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

শিক্ষার স্তর বাড়ার সঙ্গে দেশ সঠিক পথে চলছে এমন বিশ্বাসও কিছুটা কমেছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন উত্তরদাতাদের মধ্যে ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ এ মত দিয়েছেন। এইচএসসি উত্তীর্ণদের মধ্যে হারটি ৪১ দশমিক ১ শতাংশ।

খাদ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সবচেয়ে বড় উদ্বেগ

দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী, এমন প্রশ্নের উত্তরে ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কথা বলেছেন। ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ বলেছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে। এরপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা, ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান, ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ।

যে দুটি বিষয়কে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলোতেই সরকারের কাজের মূল্যায়ন সবচেয়ে নেতিবাচক। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা খারাপ হচ্ছে বলে মনে করেন ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা। জ্বালানি ও গ্যাসের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যবস্থাপনা খারাপ বলেছেন ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশ। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ নেতিবাচক মূল্যায়ন দিয়েছেন।

কঠিন এক বছর, সামনে ভালো সময়ের প্রত্যাশা

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রশ্নে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ স্পষ্ট। ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এক বছর আগের তুলনায় তাদের পরিবারের অবস্থা খারাপ হয়েছে। বিপরীতে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, তাদের অবস্থা ভালো হয়েছে।

তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা তুলনামূলক ইতিবাচক। আগামী ১২ মাসে পরিবারের অবস্থা ভালো হবে বলে আশা করছেন ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ। খারাপ হবে বলে মনে করেন ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ বলেছেন, এক বছর আগের তুলনায় তারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি আশাবাদী। ৩৯ শতাংশ কম আশাবাদী এবং ৬ দশমিক ২ শতাংশ বলেছেন, তাদের আশাবাদে কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ফ্যামিলি কার্ড ও কর নীতিতে বড় সমর্থন

সরকারের কয়েকটি নির্দিষ্ট উদ্যোগের প্রতিও মানুষের উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে। জরিপে ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা ফ্যামিলি কার্ডকে সমর্থন করেছেন। কর নীতিকে সমর্থন করেছেন ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ৭০ শতাংশ মনে করেন, সরকারের উচিত গণভোটের ফল বাস্তবায়ন করা। ফলে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা, রাজস্বনীতি এবং গণভোটের ফল বাস্তবায়নসংক্রান্ত অবস্থানের প্রতি জনসমর্থনের একটি ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে।
 
বিরোধী নেতাদের গ্রহণযোগ্যতাও উল্লেখযোগ্য

জামায়াতে ইসলামীর আমিরের কাজ ভালো বলে মনে করেন ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা। তার কাজ ভালো নয় বলে মত দিয়েছেন ২০ দশমিক ২ শতাংশ। তবে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ বলেছেন, তাকে নিয়ে মতামত দেওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্য তাদের জানা নেই।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়কের কাজ ভালো বলে মনে করেন ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ। ২৩ শতাংশ বলেছেন তিনি ভালো করছেন না। আর ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ জানিয়েছেন, এই নেতার কাজ সম্পর্কে মতামত দেওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্য তাদের জানা নেই।

নারী ও সংখ্যালঘুরা তুলনামূলক কম নিরাপদ 

নিরাপত্তা অনুভূতির ক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নিজের এলাকায় সন্ধ্যার পর একা হাঁটতে নিরাপদ বোধ করেন ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ নারী। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৭০ শতাংশ। প্রকাশ্যে ধর্ম পালন নিয়ে ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা নিজেদের নিরাপদ মনে করেছেন। মুসলিম উত্তরদাতাদের মধ্যে এই হার ৯৭ দশমিক ১ শতাংশ। হিন্দু উত্তরদাতাদের মধ্যে হার ৮২ শতাংশ।

‘সরকারের হানিমুন পিরিয়ড প্রায় শেষ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, নির্দিষ্ট সময় পরপর সরকারের কাজের মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। কারণ দুই নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে সরকারের অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণ করতে জনমত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, এই বিবেচনায় জনমত জরিপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরিপ বলছে, সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ প্রায় শেষ।

আসিফ শাহানের ভাষায়, এই মাত্রার জনসমর্থন নিয়ে সরকারের হাতে খরচ করার মতো রাজনৈতিক পুঁজি সীমিত এবং সেটি বুঝেশুনে খরচ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর উচ্চ গ্রহণযোগ্যতা সরকারের জন্য স্বস্তির খবর হলেও এর অর্থ হলো প্রধানমন্ত্রীর ভালো পারফরম্যান্সের সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্যদের পারফরম্যান্সের সামঞ্জস্য নেই।

তিনি আরও বলেন, মানুষ তাদের জীবন ও জীবিকা নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন। চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলার অবনতির মতো বিষয়গুলো সার্বিক সুশাসন নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। সরকারকে এসব চ্যালেঞ্জ কার্যকরভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।

বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, সরকারের কার্যক্রম নিয়ে এ জনমত জরিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে জনগণের মতামত বোঝার চেষ্টা করে, যা পুরোপুরি প্রতিনিধিত্বশীল নয়। নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিক জনমত জরিপ হলে সরকারের কাজ জনগণ কীভাবে দেখছে এবং কোন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, এ জরিপ সরকারের জন্য এক ধরনের ‘স্টিয়ারিং’ হিসেবে কাজ করবে। সময়ের সঙ্গে জনমতের পরিবর্তন তুলনা করে কোন সমস্যা বাড়ছে বা কমছে, সেটিও বোঝা যাবে। 

আশিক চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে জনগণ যেভাবে ইতিবাচকভাবে দেখছেন, সরকারের অন্যান্য কর্মকাণ্ড নিয়ে সেই মাত্রার আস্থা এখনো তৈরি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের ভাবমূর্তির মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা কমাতে সরকারের কাজ আরও কার্যকর করার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে জরিপে উঠে আসা বিষয়গুলোকে নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দিয়ে আগামী ছয় মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনার ওপর জোর দেন তিনি।

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রধানমন্ত্রী   তারেক রহমান  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close