শান্ত ও ঐতিহাসিক বন্দরনগরী চট্টগ্রাম হঠাৎ করেই যেন এক অস্থিরতা এবং সহিংসতার আবর্তে গিয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও রক্তক্ষয়ী ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। তুচ্ছ বাকবিতণ্ডা, পারিবারিক কলহ আর মাদকের ভয়াল ছোবলে অকালে ঝরে যাচ্ছে একের পর এক তাজা প্রাণ।
গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে নগরীর চান্দগাঁও থানার কামালবাজারের লায়লা সেন্টারের সামনে যখন এক যুবকের আর্তনাদ ভেসে আসে, তখনো কেউ ভাবেননি এটি এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যপট। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে থাকা সেই যুবকের শরীরে তখনো সামান্য প্রাণের স্পন্দন ছিল। উপস্থিত পথচারীদের আকুল চেষ্টা ম্লান করে দিয়ে নিভে যায় ২৪ বছর বয়সি যুবক মোহাম্মদ সাকিবের জীবনপ্রদ্বীপ।
সামান্য একটি মোবাইল ফোন লেনদেন নিয়ে কথা-কাটাকাটি ও বাকবিতণ্ডার জেরে এমন একটি মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে। সিএমবির আটগাছতলা এলাকার বাসিন্দা নজুম উদ্দিন ও রুজি আক্তারের ছেলে সাকিবকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসীম উদ্দিন জানান, তিন-চারজন যুবক ধারালো ছুরি দিয়ে সাকিবের ওপর হামলা চালিয়ে পালিয়ে যায়। জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। সাকিবের এই ট্র্যাজেডি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
গত কয়েক সপ্তাহে নগরের চান্দগাঁও, সদরঘাট, ডবলমুরিং এবং জেলার চন্দনাইশ ও আনোয়ারা উপজেলায় পরপর ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন একাধিক ব্যক্তি।
গত বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী পৌরসভার উল্লাপাড়া এলাকায় স্বামী মো. সলিমের কোদালের কোপে প্রাণ হারান তার স্ত্রী নুরহাবা (২৫)। কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা সলিম নিয়মিত কাজ না করায় পারিবারিক বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করেন।
আনোয়ারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান জানান, ঘাতক স্বামীকে আটক করা হয়েছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
গত ৬ আগস্ট সন্ধ্যায় সদরঘাট থানার পশ্চিম মাদারবাড়ি এলাকায় অজ্ঞাত কারণে ছুরিকাঘাতে নিহত হন শাহিন (৪৫) নামের এক ব্যক্তি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক জানান, গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে জরুরি বিভাগে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নগরের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এখন অপরাধীদের সহিংসতা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। গত শনিবার রাতে ডবলমুরিং থানার আমবাগান এলাকায় চিহ্নিত মাদক মামলার আসামি আলমগীরকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে অপরাধীদের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন উপপরিদর্শক (এসআই) মবিনুল ইসলাম।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আমিনুর রশীদ জানিয়েছেন, এসআই মবিনুলের মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাত রয়েছে এবং তিনি চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো পারিবারিক নৃশংসতার চিত্র দেখা যায় গত ২৫ জুলাই আনোয়ারার পূর্ব গুজরা গ্রামে।
দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছেলে রিমন দাশগুপ্ত (৪২) তার মা কল্পনা দাশ (৫৫) এবং তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসা বাবা স্বপন দাশগুপ্তকে (৬৫) এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। একমাত্র সন্তানের হাতে বাবা-মায়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু চট্টগ্রামজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চলের সৃষ্টি করেছে।
চট্টগ্রামে একের পর এক এসব নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানী ড. মনজুর-উল আমিন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, “তরুণ সমাজের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়, হতাশা ও পরমতসহিষ্ণুতার মারাত্মক ঘাটতি সামাজিক বন্ধনগুলোকে শিথিল করে দিচ্ছে। ফলে ছোটখাটো বিরোধ কিংবা তুচ্ছ কারণেও মানুষ তাৎক্ষণিক হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চরম সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছে। অপরাধের এই ভয়াবহ প্রবণতা রুখতে কঠোর আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি মাদক দমনে শূন্য সহনশীলতা নীতি প্রয়োগ এবং ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলেও মনে করেন তিনি।”
কেকে/সাশ