দেশজুড়ে গ্যাস সংকটের কালো ছায়া এখন আরও ঘনীভূত হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ এবং আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় রাজধানীজুড়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে জ্বালানি সংকট।
এর আঁচ সরাসরি গিয়ে পড়েছে শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি এবং পরিবহন খাতের ওপর। একদিকে জ্বালানি সংকটের মারপ্যাঁচে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন কোটি টাকার লোকসান গুনে দিশেহারা শিল্পোত্তোক্তারা, অন্যদিকে গ্যাসহীনতায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ নগরবাসী।
রান্নাঘরের চুলা জ্বালাতে না পেরে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন গৃহিণীরা, আর ঢাকা শহরজুড়ে প্রায় প্রতিটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে এখন যানবাহনের দীর্ঘ সারি লেগেই আছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদামতো গ্যাস না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বাস, সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা।
কোথাও কোথাও পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বা সরবরাহ বন্ধ থাকায় পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। জ্বালানি সংগ্রহের এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার কারণে একদিকে যেমন সড়কে গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মঘণ্টা অপচয় হওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।
গত ২১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া গ্যাস সংকট শিল্পাঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। কারখানাগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, কোনো কোনো ইউনিট বন্ধ রাখা হচ্ছে এবং শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে।
গত বুধবার (১৯ আগস্ট) এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালটি মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এর ফলে আগে থেকেই সংকটাপন্ন গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
বর্তমানে দেশে দিনের বেলা ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ১৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর ফলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানা, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রতিদিন ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেয়ে ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এর অর্থ হলো, জাতীয় গ্রিডে আসা গ্যাসের সিংহভাগই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে। ফলে যেসব শিল্পকারখানা বয়লার, উৎপাদন প্রক্রিয়া বা নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের (ক্যাপটিভ পাওয়ার) জন্য সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তারা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না।
গত সপ্তাহে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও গত দুদিন ধরে শিল্পাঞ্চলগুলোতে আবারও তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। নরসিংদীর পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, সেখানে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় গত দুই দিনে ১০০টিরও বেশি টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস সংকটের এই প্রভাব গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের পোশাক কারখানাগুলোতেও তীব্রভাবে পড়ছে।
রান্নার পাতিলে ফুরোচ্ছে পুরো দিন
রাজধানীর খিলগাঁও খিদিরপুর এলাকার একটি টিনশেড বাসা। সেখানে সারিবদ্ধ আটটি ছোট কক্ষ, আর ঘরগুলোতে বসবাস করছে আটটি মধ্যবিত্ত পরিবার। এতগুলো মানুষের রান্নাবান্নার একমাত্র ভরসা বাইরের একটিমাত্র রান্নাঘর। সেখানে রয়েছে গ্যাসের একটিমাত্র সংযোগের মাত্র দুটি চুলা। কিন্তু দেশজুড়ে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটে সেই সামান্য চুলা দুটোই এখন এক প্রকার নিষ্ক্রিয়। গ্যাসের এত কম চাপ যে, একটি পরিবারের একটি পদের রান্না শেষ করতেই কেটে যাচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। চুলার পাশে পালা ধরে বসে থাকতে হয় পরের পরিবারের নারীদের। অনেক সময় দীর্ঘ অপেক্ষার পরেও শেষ পর্যন্ত রান্নার সুযোগটুকুও জোটে না।
দুপুর সাড়ে ১২টা। ওই রান্নাঘরে গিয়ে দেখা গেল, চুলার পাশে উন্মুখ হয়ে বসে আছেন গৃহবধূ রোকেয়া বেগম। বেলা ১১টায় রান্না শুরু করেছেন তিনি, অথচ দেড় ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও একটি পদের রান্নাও শেষ হয়নি। চুলার একপাশে ছোট পাতিলে চড়ে আছে ডালের পাতিল, অন্যটিতে গরম হচ্ছে সামান্য পানি।
রোকেয়া বেগম আক্ষেপ নিয়ে বলেন, “গ্যাসের যে করুণ অবস্থা, তাতে সরাসরি চাল দিয়ে ভাত বসানোর উপায় নেই। আগে পানি গরম করে নিতে হয়, তারপর চাল দিতে হয়। ডাল রান্না করতেই যেখানে দুই ঘণ্টা চলে যায়, ভাত হতে তার চেয়েও বেশি সময় লাগে। আট পরিবারের জন্য মোটে দুটি চুলা, তার ওপর গ্যাসের এই খরা—সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চুলা আর রান্নার পেছনেই কেটে যায় পুরো দিন।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুধু এই টিনশেড ঘরটিই নয়, পুরো এলাকার আবাসিক লাইনে গ্যাসের চাপ এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। দিনের বেলায় সামান্য গ্যাসের দেখা মিললেও তাতে রান্নার কাজ তো দূরের কথা, চা ফোটানোও অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবারকে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে, যা নিম্ন আয়ের এসব মানুষের দৈনন্দিন বাজেটে মারাত্মক টান ফেলছে।
শুধু খিলগাঁও নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকটে রান্নায় সমস্যা হচ্ছে। কোথাও চুলায় গ্যাসের চাপ এত কম যে রান্না করতে স্বাভাবিক সময়ের কয়েক গুণ বেশি লাগছে। কোথাও আবার দিনের বড় একটা সময় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সারিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন গাড়িচালকেরা। গ্যাস না থাকায় কোনো কোনো স্টেশন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর সঙ্গে দিনের বিভিন্ন সময় ও রাতের লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
নামমাত্র গ্যাসে দিশেহারা চালকরা
তীব্র গ্যাস সংকটের আঁচ রান্নাঘর পেরিয়ে এখন সরাসরি আঘাত হেনেছে পরিবহন খাতেও। আবাসিক এলাকার চুলার মতো সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও তৈরি হয়েছে চরম দুর্ভোগ। পর্যাপ্ত চাপের অভাবে প্রতিটি স্টেশনের ভেতরে ও বাইরে দীর্ঘ গাড়ির সারি লেগেই আছে, আর সামান্য গ্যাস নিতে চালকদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
দুপুর নাগাদ মিরপুরের ‘গ্রিন ভিউ সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন’ ঘুরে দেখা গেল এই করুণ চিত্র। স্টেশনের ডিসপেনসার অপারেটর মো. সজিবুল ইসলাম জানান, গত কয়েক দিনের তুলনায় আজ গ্যাসের চাপ আরও তলানিতে নেমেছে। আগে যেখানে চাপ পাওয়া যেত ৮০ থেকে ৯০, আজ তা কমে সর্বোচ্চ ৭০-এ ঠেকেছে।
দীর্ঘ এই অপেক্ষায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন চালকরা। ওই স্টেশনে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন ব্যক্তিগত গাড়ির চালক রহিম মিয়া। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ৪০ মিনিট অপেক্ষার পর বেলা ১১টার দিকে তাঁর গাড়িতে মাত্র ১৭৮ টাকার গ্যাস ঢোকে।
হতাশা প্রকাশ করে রহিম মিয়া বলেন, “গ্যাসের চাপ ভালো থাকলে এই টাকায় এসি চালিয়ে অনায়াসে ৩০ কিলোমিটার পথ চলা যেত। কিন্তু এখন প্রেশার কম থাকায় পাইপে গ্যাসের চেয়ে হাওয়াই বেশি ঢোকে। ফলে যেটুকু গ্যাস মেলে, তা দিয়ে বর্তমান ট্রাফিক জ্যামে গন্তব্যে পৌঁছানোই দায় হয়ে দাঁড়ায়।”
একই রকম দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা জানান যাত্রীবাহী বাসের চালক রফিকুল ইসলাম। সিটি বাসের এই চালক জানান, তার গাড়ির পুরো ট্যাংকে সাধারণত আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার গ্যাস ধরে। কিন্তু দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও আজ ট্যাংকে নামমাত্র গ্যাস নিতে পেরেছেন তিনি, যা দিয়ে অর্ধেক পথ পাড়ি দেওয়াই অসম্ভব।
কেকে/সাশ