একসময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী রান্নার মসলা হিসেবে পরিচিত ছিল চুইঝাল। এখন সেই চুইঝাল ঢুকে পড়ছে রাজশাহীর কৃষকের মাঠেও। পরীক্ষামূলক চাষের ধাপ পেরিয়ে রাজশাহী ও নাটোরে শুরু হয়েছে বাণিজ্যিক চাষ। দাম ভালো, বাড়তি জমির প্রয়োজন নেই এবং পানের মতোই চাষপদ্ধতি হওয়ায় ফসলটি নিয়ে আশাবাদী কৃষি বিভাগ।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার জাহানাবাদ ইউনিয়নের চান্দোপাড়ায় ইতিমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে চুইঝাল চাষ করছেন কৃষক আব্দুর রশিদ মোল্লা। বাড়ির পাশে আমগাছের নিচে প্রায় ১০ শতক জমিতে চুইঝালের গাছ লাগিয়েছেন। জমিতে গাছগুলো বেশ সতেজ ও সবল হয়ে বেড়ে উঠছে।
কৃষক আব্দুর রশিদ মোল্লা বলেন, ‘মোহনপুর কৃষি অফিস ও রাজশাহী হর্টিকালচার সেন্টারের সহযোগিতায় চুইঝাল চাষের উদ্যোগ নিয়েছি। পানের চাষের অভিজ্ঞতা থাকায় চুইঝালের পরিচর্যা তুলনামূলক সহজ মনে হয়েছে। এখন পর্যন্ত গাছে কোনো রোগবালাই দেখা যায়নি। স্থানীয়ভাবে চারা উৎপাদন করে গ্রামের অন্য কৃষকদের মধ্যেও তা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চুইঝালের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আছে। বাজারে দামও ভালো। আমাদের এলাকায় এখনো বড় বাজার তৈরি হয়নি। তবে হর্টিকালচার সেন্টার বাজারদরে চুইঝাল কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছে।’
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মোহনপুরে পানের চাষ ভালো হওয়ায় চুইঝালের জন্য এলাকাটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। চুইঝালের চাষপদ্ধতিও অনেকটা পানের মতো। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এখানে পরীক্ষামূলকভাবে চুইঝালের চাষ শুরু করা হয়। প্রায় দুই বছর পর এর ফলন ও গাছের বৃদ্ধি সন্তোষজনক হওয়ায় এখন চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চুইঝাল মূলত লতাজাতীয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। এর কাণ্ড, শিকড় ও ডাল রান্নায় মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে গরু, খাসি, হাঁস ও মুরগির মাংসে চুইঝালের ব্যবহার দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। রান্নায় এটি যোগ করলে খাবারে ঝাঁঝালো স্বাদ ও আলাদা ঘ্রাণ তৈরি হয়।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে চুইঝাল দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী মসলা। বাজারেও এর চাহিদা বাড়ছে। মানভেদে শুকনা চুইঝাল প্রতি কেজি ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। কাঁচা ও শুকনা দুই অবস্থাতেই বাজার রয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার রেস্তোরাঁয় চুইঝাল দিয়ে রান্না করা মাংস এখন বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে চুইঝালের সঙ্গে তেমন পরিচয় ছিল না। স্থানীয়ভাবে চাষ হচ্ছে জানতে পেরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোঁজ নিয়ে এর জনপ্রিয়তার কথা জানতে পারি। আমাদের এলাকায় যখন চুইঝাল হচ্ছে, আমরাও এখন মাংসে দিয়ে খেয়ে দেখব।’
শুধু উৎপাদন নয়, চারা নিয়েও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। নাটোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক শামীম ইকবাল জানান, সেখানে চুইঝালের চাষে ভালো ফল পাওয়ার পর উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি চুইঝালের কাটিং চারা ২৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
তবে চুইঝাল চাষের জন্য তুলনামূলক উঁচু জমি প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
রাজশাহী হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ ছাইয়্যেদা দিল ছালিন বলেন, ‘মোহনপুরে পরীক্ষামূলকভাবে চুইঝাল দেওয়ার পর ফলন ও বৃদ্ধি ভালো পাওয়া গেছে। নাটোরেও চাষ হচ্ছে। পান ও চুইঝালের চাষপদ্ধতিতে মিল থাকায় মোহনপুরকে চাষ সম্প্রসারণের জন্য উপযোগী মনে করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চুইঝালের বাজার ভালো। দক্ষিণাঞ্চল ও ঢাকার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় চুইঝাল দিয়ে গরু, মহিষ, খাসি, মুরগি ও হাঁসের মাংস রান্না করা হচ্ছে। ফলে এর বাজার আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। চুইঝালের আরেকটি সুবিধা হলো-এর জন্য আলাদা করে বড় জমি না থাকলেও চলে। ছায়াযুক্ত জায়গা কিংবা আম, নারিকেল ও সুপারি গাছকে অবলম্বন করে এটি বেড়ে উঠতে পারে। ফলে বাড়ির আঙিনা, বাগান বা বিদ্যমান বাগানের গাছের সঙ্গে সমন্বয় করে
চাষ করা সম্ভব।
ছাইয়্যেদা দিল ছালিন আরও বলেন, ‘রাজশাহীতে এখনো চুইঝালের বড় বাজার গড়ে ওঠেনি। তবে চাষের ফল ভালো হওয়া, তুলনামূলক বেশি দাম, কম জায়গায় উৎপাদনের সুযোগ এবং রেস্তোরাঁয় বাড়তে থাকা চাহিদা-সব মিলিয়ে কৃষি বিভাগ এটিকে সম্ভাবনাময় অপ্রচলিত ফসল হিসেবে দেখছে। কৃষকদের মধ্যে চারা বিতরণ ও চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ সফল হলে রাজশাহীর কৃষিতে চুইঝাল হয়ে উঠতে পারে নতুন অর্থকরী ফসল।’
কেকে/এআই