মাঠজুড়ে দর্শকদের উপচেপড়া ভিড়। কোথাও গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী মোরগ লড়াই, আবার কোথাও ফুটবল নিয়ে কিশোর-তরুণদের উচ্ছ্বাস। মোরগ লড়াইয়ের উত্তেজনা শেষে আতশবাজি ফোটানো ও ফানুস উড়িয়ে শুরু হয় মিনি ফুটবল টুর্নামেন্ট। খেলোয়াড়দের দৌড়ঝাঁপ আর দর্শকদের করতালিতে প্রাণ ফিরে পায় কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদলের একটি মাঠ।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের স্বল্প যশোদল দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নরসুন্দা স্পোর্টিং ক্লাবের উদ্যোগে ব্যতিক্রমী এ আয়োজন করা হয়।
প্রথমে অনুষ্ঠিত হয় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মোরগ লড়াই। এরপর আতশবাজি ও ফানুস উড়িয়ে শুরু হয় মিনি ফুটবল টুর্নামেন্ট। এতে মুখোমুখি হয় ‘কিংস এফসি’ ও ‘ব্ল্যাক স্টর্ম’। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে ১-০ গোলে জয় পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ব্ল্যাক স্টর্ম।
খেলা দেখতে মাঠে জড়ো হন স্থানীয় কিশোর-তরুণসহ বিভিন্ন বয়সী দর্শক। নরসুন্দা স্পোর্টিং ক্লাবের মোহাম্মদ সালমান, মো. শাকিল মিয়া, জান্নাতুল ফেরদৌস, জাকারিয়া হোসেন রাব্বিসহ সংগঠনের সদস্যরা এ আয়োজন করেন।
আয়োজনটির অন্যতম ব্যতিক্রমী দিক ছিল অতিথি নির্বাচন। সাধারণত ক্রীড়া অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি কিংবা বিত্তশালী ব্যক্তিদের অতিথি করা হলেও এ আয়োজনে অতিথি করা হয় অটোরিকশাচালক, দিনমজুর ও কৃষকদের।
ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ কামাল মিয়া, দিনমজুর মাতু মিয়া, কৃষক বকুল মিয়া ও অটোরিকশাচালক সুমন হোসেন। পরে তারা চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলের খেলোয়াড়দের হাতে ট্রফি তুলে দেন।
রানার্সআপ দলের খেলোয়াড় রাফিন ইসলাম নবাব বলেন, ‘খেলায় হার-জিত থাকবেই। আজ জিততে না পারলেও আমরা আনন্দিত। এ ম্যাচ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। আগামীতে আরও ভালো প্রস্তুতি নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চেষ্টা করব।’
চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড় মোহাম্মদ তানজিল বলেন, ‘বন্ধুরা মিলে খেলায় অংশ নিয়ে জয় পাওয়ায় আমরা সবাই খুবই আনন্দিত। এ জয় আমাদের আরও ভালো খেলার অনুপ্রেরণা দেবে। ভবিষ্যতেও ভালো খেলে দলের জন্য সাফল্য বয়ে আনতে চাই।’
স্থানীয় অভিভাবক সুমন বলেন, ‘আজকের খেলার পরিবেশ দেখে খুব ভালো লেগেছে। আমাদের ছেলেরা এভাবে খেলাধুলার আয়োজন করছে, এটা সত্যিই ভালো লাগার বিষয়। ভবিষ্যতে যেন আরও বেশি এমন খেলা আয়োজন করা হয়, সেই প্রত্যাশা করি।’
আয়োজক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আজকের খেলায় কোনো বিশেষ অতিথি বা প্রধান অতিথি ছিলেন না। যারা উপস্থিত ছিলেন, তারা অটোরিকশাচালক, দিনমজুর ও কৃষক। মূলত তাদের নিয়েই আমাদের আয়োজন। আমরা চাই না এলাকার কোনো শিশু-কিশোর নষ্ট হয়ে যাক বা মাদকের প্রতি আসক্ত হোক। তাই তাদের খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত রাখতে দুই-তিন মাস পরপর এমন আয়োজন করার চেষ্টা করি।’
আরেক আয়োজক জাকারিয়া হোসেন রাব্বি বলেন, ‘ক্রীড়াই শক্তি, ক্রীড়াই বল। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো এলাকার তরুণদের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করা এবং মাদক থেকে দূরে রাখা। খেলাধুলার মাধ্যমে তাদের নেশা থেকে দূরে রাখাই আমাদের লক্ষ্য। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে খেলাধুলার আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
অতিথি মোহাম্মদ কামাল মিয়া বলেন, ‘আমি একজন অটোরিকশাচালক। আমাদের মতো সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে খেলাধুলার অনুষ্ঠানে অতিথি করায় আমরা আনন্দিত। ছেলেরা খেলাধুলার সঙ্গে থাকলে তাদের সময়টা ভালো কাজে কাটবে। এতে তারা মাদক ও বিভিন্ন খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকবে। এমন আয়োজন আরও বেশি হওয়া দরকার।’
আয়োজকরা জানান, নিয়মিত খেলাধুলার মাধ্যমে এলাকার কিশোর-তরুণদের মাঠমুখী করার পাশাপাশি মাদক ও নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে মোরগ লড়াইয়ের মতো গ্রামীণ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার ধারাবাহিকতাও বজায় রাখতে চান তারা।
কেকে/এআই