দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এরই মধ্যে নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে প্রস্তাবটি।
সোমাবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন হলে বৃহস্পতিবারের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো স্বস্তির বার্তা দিলেও এর আর্থিক চাপ সামলানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে। একইসঙ্গে তাদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের বাইরে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। ফলে বাড়তি ব্যয়ের অর্থ সংস্থান, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং বাজেট ব্যবস্থাপনা সামলানোই হবে পে-স্কেল বাস্তবায়নের অন্যতম বড় পরীক্ষা।
অর্থমন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, নতুন পে-স্কেলের সুপারিশ চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াও ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সচিব কমিটির সব সদস্য চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। আজ সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাবটি এজেন্ডাভুক্ত করে উপস্থাপন করা হতে পারে। মন্ত্রিসভায় খসড়াটি অনুমোদিত হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সময়সূচি মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুকেও নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে প্রত্যাশা আরও বেড়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোয় প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ রয়েছে। প্রথম বছরে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর করা হতে পারে। দ্বিতীয় বছরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা নতুন হারে কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে।
এদিকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এর অর্থের সংস্থান। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সংশ্লিষ্ট খাতে মোট বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে বিদ্যমান বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষ করে সরকারের বর্তমান রাজস্ব পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা কম ছিল। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। ফলে নতুন পে-স্কেলের বাড়তি বেতন-ভাতার অর্থ জোগান দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থমন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবিত নতুন পে-স্কেলে সরকারি চাকরির বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে প্রতিটি গ্রেডের মূল বেতন পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রাখা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ১ম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমানের তুলনায় প্রায় ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন প্রায় ১০৫ শতাংশ বাড়বে। একইসঙ্গে ২০টি গ্রেডের মধ্যকার বেতন ব্যবধান ও আনুপাতিক হার নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে পে-স্কেলের বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকারকে বাজেটের অন্যান্য খাতে ব্যয় কমানো, বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস অথবা অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এতে একদিকে সরকারের সামগ্রিক ব্যয় ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হবে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের অর্থায়ন ও বিনিয়োগেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেছেন, বর্তমানে সরকারের যে আর্থিক সক্ষমতা, তাতে বেতন স্কেল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা নেই। কিন্তু সক্ষমতা সীমিত হলেও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বেতন স্কেল দিতে হবে। এজন্য সরকারের ওপর কিছুটা আর্থিক চাপ পড়বে। এ চাপ সরকারকে বহন করতেই হবে।
তিনি বলেন, এ জন্য সরকারকে রাজস্ব আহরণে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে রাজস্ব আহরণে আন্তরিক হয় এবং এ বিষয়ে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পে-স্কেল বাস্তবায়নে বড় ধরনের সমস্যা হবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি একদিকে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘসময় ধরে মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় বেতন বৃদ্ধি সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমাতে পারে। একইসঙ্গে তাদের ভোগ ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
তাদের মতে, বিপরীত দিকও রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ফলে সরকারের মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এই বাড়তি অর্থ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হলে সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে। উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ একই হারে না বাড়লে এর প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও সমন্বয় করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে বাজারে তাদের চাহিদা বাড়বে। কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহ একই হারে না বাড়লে অতিরিক্ত চাহিদা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে এর প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা কষ্টকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে পে-স্কেলের বাড়তি ব্যয়ের অর্থ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে জোগান দেওয়া হলে নতুন ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ বেড়ে গেলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার একটি অংশ সরকারি খাতে চলে যেতে পারে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও পড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপ : নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। এতে বাজারে ভোগ ও সামগ্রিক চাহিদা বাড়তে পারে। কিন্তু একই সময়ে পণ্য ও সেবার সরবরাহ সেই অনুপাতে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। পে-স্কেল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বাড়িভাড়া, পরিবহন ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগও নিতে পারেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।
বাজেট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে : পে-স্কেলের ফলে সরকারের রাজস্ব বাজেটে বেতন, ভাতা, পেনশন ও অন্যান্য সুবিধা বাবদ ব্যয় বাড়বে। এতে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের অংশ বড় হয়ে উঠতে পারে। রাজস্ব আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোসহ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হবে। ফলে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নেও কিছুটা সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে।
রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকি : নতুন বেতন কাঠামোর অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়ানো জরুরি হবে। কিন্তু রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। তখন ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক খাতসহ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়তে পারে। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতায় চাপ এবং সুদহারের ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেসরকারি ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর পরোক্ষ চাপ : পে-স্কেলের সুবিধা মূলত সরকারি চাকরিজীবীরা পেলেও এর ফলে সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির প্রভাব পড়বে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের ওপর। বেসরকারি চাকরিজীবী, কৃষক, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় একই হারে না বাড়লে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। একইসঙ্গে সরকারি চাকরির বেতন-ভাতা আকর্ষণীয় হয়ে উঠলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর্মীদের বেতন বাড়ানোর চাপও তৈরি হবে।
কেকে/ এমএস