মেঠোপথ, ধানের খেত আর শান্ত জলাশয়ে ঘেরা সবুজ এক নির্জন গ্রাম কানাইপুকুর। সারা দিন গ্রামের নিজস্ব একটা নিঝুম নীরবতা থাকে। কিন্তু সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়তেই বদলে যেতে শুরু করে পুরো দৃশ্যপট। দূর-দূরান্তের নীল দিগন্ত থেকে হঠাৎ করেই সাঁঝের মেঘের মতো উড়ে আসে অসংখ্য ডানার সারি। কোনোটা আকাশে উঁচুতে ডানা মেলে চক্কর কাটে, কোনোটা আবার ক্লান্ত ডানা দুটোকে একটু জিরিয়ে নিতে সোজা গিয়ে বসে চেনা গাছের ডালে। মুহূর্তের মধ্যেই এক দোতলা বাড়ির চারপাশের সুবিশাল মেহগনি, আম ও বাঁশঝাড়গুলো যেন আর নিছক গাছ থাকে না, পরিণত হয় একেকটি মুখরিত পাখির দ্বীপে।
ডালে ডালে তখন হাজারো ডানার আকুল ঝাপটানি আর অবিরাম কিচিরমিচির। কোথাও ছানাদের মুখে খাবার তুলে দিতে ব্যস্ত মা-বাবা, কোথাও বা ভালোবাসার স্পর্শে গা ঘেঁষে বসে থাকা দুটি পাখি। মানুষ আর প্রকৃতির এই অপূর্ব, মায়াবী মেলবন্ধন দেখতে গ্রামের পথটিতে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকেন মুগ্ধ গ্রামের মানুষ।
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের এই ছোট্ট গ্রাম কানাইপুকুর এখন আর শুধু ভৌগোলিক কোনো নাম নয়, মানুষের কাছে এটি এক জীবন্ত আখ্যান—‘পাখিদের গ্রাম’। আর এই অভয়াশ্রম গড়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে গ্রামের মরহুম আলহাজ্ব আব্দুস ছোবহান মন্ডলের ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি। বাড়ির গায়ে জড়িয়ে থাকা সুবিশাল গাছগুলোকে কেন্দ্র করেই বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে পাখিদের এই মহাজাগতিক এক কলোনি।
স্থানীয়দের হিসাবে, প্রতি মৌসুমে এখানে প্রায় ৫০ হাজার শামুকখোল এসে আশ্রয় নেয়। সঙ্গে ডানা মেলে উড়ে আসে শ্বেতশুভ্র বক, কানিবক, ডানা ঝাপটানো পানকৌড়ি আর আকাশের বুক চিরে নামা শঙ্খচিল। বিশাল এই বাড়িটির প্রাঙ্গণ প্রতিদিন পরিণত হয় হাজারো পাখির সুরের মেলায়।
গাছের ডালে এই পাখির বিশাল সাম্রাজ্য কিন্তু এক দিনে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে লুকিয়ে আছে প্রায় দুই দশকের এক গভীর আবেগ আর পরম ভালোবাসার ইতিহাস। মন্ডল পরিবারের সদস্যরা স্মৃতির পাতা উল্টে জানান, ২০০৭-০৮ সালের কথা। এক বর্ষার মুখে প্রথম দু-একটি পথভোলা শামুকখোল পাখি এসে আশ্রয় নিয়েছিল এই বাড়ির উঁচু ডালগুলোতে। পরিবারের মানুষগুলো সেগুলোকে তাড়িয়ে দেননি, বরং পরম মমতায় কোনো ক্ষতি না করে থাকতে দিয়েছিলেন। অবুঝ পাখিগুলো বোধহয় সেই স্নেহের ভাষা বুঝতে পেরেছিল। নিরাপদে সন্তান লালন-পালন করে সে বছর চলে গেলেও, পরের বছর তারা ফিরে আসে দল বেঁধে আরও নতুন সঙ্গী নিয়ে। সেই থেকে প্রতি বছরই তাদের ফিরে আসা, প্রতি বছরই পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে পাখির সংখ্যা ও বাসার ভিড়। দেখতে দেখতে মরহুম আব্দুস ছোবহান মন্ডলের বাড়ির বিশাল পরিমণ্ডলই হয়ে ওঠে এই পরিযায়ী বিহঙ্গদলের চিরচেনা, পরম নির্ভরযোগ্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
বর্তমানে এই বিশাল পাখি কলোনি পরম মমতায় আগলে রাখেন মরহুম আব্দুস ছোবহান মন্ডলের ছোট ছেলে জাহাঙ্গীর আলম মন্ডল। পাখিগুলোর প্রতি নিজের আত্মিক টানের কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘২০০৭-০৮ সালের দিকে প্রথম পাখি আসতে শুরু করে। তখন অল্প কয়েকটি পাখি ছিল। এরপর থেকে প্রতিবছরই তারা আসছে। ধীরে ধীরে পাখির সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এখন শামুকখোলের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এর সঙ্গে বক, কানিবক, শঙ্খচিল, পানকৌড়িসহ বিভিন্ন পাখিও আসে। পাখিগুলো আমাদের কাছে অনেক আপন হয়ে গেছে। আমরা তাদের কোনো ক্ষতি করি না। কেউ যেন পাখির বাসা নষ্ট না করে বা গাছে উঠে পাখিদের বিরক্ত না করে, সেদিকে আমরা খেয়াল রাখি। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পাখি দেখতে আসে। তাদেরও অনুরোধ করি, পাখিদের যেন বিরক্ত করা না হয়।’
দিনের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে খাবারের সন্ধানে কানাইপুকুরের পাখিরা একে একে ডানা মেলে উড়ে যায় আশপাশের বিস্তীর্ণ ধানের খেত, পুকুর আর বিল-ঝিলের জলে। সারা দিন ধরে নিঃশব্দ থাকে গ্রামটি। কিন্তু সাঁঝের আলো-আঁধারিতে কানাইপুকুর আবার জেগে ওঠে এক অন্য রূপ নিয়ে। দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে পেটের ক্ষুধা মেটিয়ে ঘরে ফেরা পাখিদের আনন্দ যেন উপচে পড়ে কানাইপুকুরের আকাশে। গাছে ফিরেই মা-পাখির কাঙাল আকুতিতে ডানা ঝাপটাতে থাকে কচি ছানারা। এই মুহূর্তটি গ্রামের মেঠোপথে এমন এক স্বর্গীয় আবেগের জন্ম দেয়, যা সচরাচর শহরের যান্ত্রিক কোলাহলে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
পাখিদের এই অভয়াশ্রমের একটি অদ্ভুত মায়াবী জীবনচক্র রয়েছে। প্রতি বছর এপ্রিলের শুরুর দিকে হাওয়ার টানে প্রথম ঝাঁক এসে কানাইপুকুরে পা রাখে। এপ্রিলের শেষ নাগাদ শুরু হয় বাসা তৈরি আর ডিম পাড়ার নীরব ব্যস্ততা। মে থেকে জুনের প্রথমার্ধে ডিম ফুটে বের হয় একঝাঁক কচি ছানা। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে কানাইপুকুরের রূপ দেখা যায় সবচেয়ে পূর্ণতায়। এ সময় বড় হওয়া ছানারা উড়তে শেখে, ডানা ঝাপটে এক ডাল থেকে অন্য ডালে লাফিয়ে চলে, আর মায়ায় ভরিয়ে রাখে পুরো গ্রাম। এরপর অক্টোবর পার হতেই, শীতের হাওয়া ছোঁয়ার আগেই, নভেম্বর থেকে মার্চ দীর্ঘ কয়েক মাসের জন্য এরা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, চলে যায় কোনো অদেখা গন্তব্যে। কিন্তু এপ্রিলের কালবৈশাখীর মেঘ জমলেই পুরোনো ঠিকানার টানে আবার শত শত মাইল উড়ে এসে আশ্রয় নেয় এই মন্ডল বাড়িতে।
গ্রামের মানুষের কাছে এই পাখিরা এখন আর কোনো ভিনদেশি পাখি নয়, কানাইপুকুরের আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম মন্ডল বলেন, ‘অনেক বছর ধরে এই পাখিগুলো এখানে আসে। প্রথম দিকে এত পাখি ছিল না। ধীরে ধীরে সংখ্যা বেড়েছে। এখন পাখিগুলো আমাদের গ্রামের পরিচয়ের সঙ্গে মিশে গেছে। সকালে পাখির ডাক শুনে ঘুম ভাঙে, আবার সন্ধ্যায় তাদের ফিরে আসার দৃশ্য দেখতে ভালো লাগে।’
কৃষক কাশেম মন্ডল হাসিমুখে জানান, ‘পাখিগুলো আমাদের কোনো ক্ষতি করে না। বরং এত পাখির কারণে কানাইপুকুরের নাম মানুষ চিনছে। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন পাখি দেখতে আসে। এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।’
দর্শনার্থীদের আনাগোনা ও তাদের দায়িত্বশীল আচরণের কথা তুলে ধরে মন্ডল বাড়ির ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ মানিক বলেন, ‘প্রতিবছর পাখিগুলো ফিরে আসে। বিকেলের দিকে যখন হাজার হাজার পাখি একসঙ্গে আসে, তখন বাড়ির চারপাশের পরিবেশই বদলে যায়। মানুষজন ছবি তুলতে আসে, ভিডিও করে। আমরা তাদের সহযোগিতা করি। তবে পাখিদের বিরক্ত করা যাবে না—এটা সবাইকে মনে রাখতে হবে।’
কানাইপুকুরের এই উপাখ্যান কোনো কৃত্রিম চিড়িয়াখানার গল্প নয়, এখানে নেই কোনো লোহার খাঁচার নিষ্ঠুরতা বা কৃত্রিমতার ছোঁয়া। এটি কেবলই মানুষের অকৃত্রিম মমতা আর মুক্ত পাখিদের নিখাদ বিশ্বাসের এক অমলিন মহাকাব্য। যে যুগে মানুষ ইট-কাঠের নগরায়ণে প্রকৃতিকে ধ্বংস করতে উদ্যত, সেই যুগে কানাইপুকুরের এই মন্ডল বাড়িটি যেন এক টুকরো শান্তির স্বর্গোদ্যান, যা প্রমাণ করে প্রকৃতিকে ভালোবাসলে প্রকৃতিও মানুষকে নিজের আপন করে নেয়।
পাখিদের এই অনন্য নিরাপদ আবাসস্থল প্রসঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিশ্রুতির কথা জানান ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির মুন্সি। তিনি বলেন, ‘কানাইপুকুরের পাখি কলোনি প্রকৃতির একটি অনন্য সৃষ্টি। পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল রক্ষায় স্থানীয়দের সচেতনতা ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। পাখি শিকার ও তাদের বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি পাখিদের আবাসস্থল গাছগুলোও রক্ষা করতে হবে। কলোনিটিকে সংরক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তোলার বিষয়ে সম্ভাব্য উদ্যোগ নেওয়া হবে।’