আজ ১ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপির) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে দলটি মানুষের ভোটাধিকার, বহুদলীয় গণতন্ত্র, জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ভূমিকা রেখে চলেছে। নানা প্রতিকূলতা, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েও বিএনপির পথচলা গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকারেরই প্রতিচ্ছবি।
তবে এবারের বার্ষিকী দলটির জন্য এক ভিন্ন তাৎপর্য বহন করছে। দীর্ঘ পথপরিক্রমা শেষে দলটি এখন বিরোধী আসনে নয়, রাষ্ট্রক্ষমতায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ফলে এ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এখন শুধু দলীয় উৎসবের উপলক্ষ নয়; এটি একই সঙ্গে সরকার হিসেবে দলটির প্রথম ছয় মাসের কাজের হিসাব মেলানোর একটি সময়ও বটে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও প্রতীক্ষার পর ক্ষমতায় আসা একটি দলের কাছে জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই ছিল অনেক বেশি। ভোটাররা চেয়েছিলেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং একটি জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ক্ষমতায় এসে সেগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই এখন সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ।
বর্তমান সময়ে দেশের সবচেয়ে দৃশ্যমান সংকট জ্বালানি খাতে। গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ ঘাটতির কারণে দেশজুড়ে ব্যাপক লোডশেডিং চলছে। কোথাও কোথাও সারা দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে। স্পট মার্কেটে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির অনিশ্চয়তা এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম। বাজারে সবজির দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে বলে সংসদেও উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। আর টিসিবির ট্রাকের পেছনে দীর্ঘ লাইন এখনো নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সংসদে বিরোধী পক্ষ থেকে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।
এ সংকটগুলোর প্রেক্ষাপটে সরকারের ছয় মাসের কাজকে একনজরে ভালো-মন্দ দুই দিক থেকেই দেখা প্রয়োজন। ইতিবাচক দিক থেকে বলা যায়, সরকার প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজনীয় খাতে বরাদ্দ ধরে রাখার কথা বলেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মব সহিংসতার মতো কিছু সূচকে উন্নতির দাবি করা হয়েছে। তবে তা সন্তোষজনক নয়। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিকল্পনা এবং দরিদ্র মানুষের মধ্যে সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদানের কর্মসূচিও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে ব্যর্থতার দিকগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারের প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবে রূপ পায়নি; বরং পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে বলে বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ এসেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সাফল্য এখনো অধরা—সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমার বদলে বেড়েছে বলেই বাজারের চিত্র সাক্ষ্য দেয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ। সরকার বারবার পূর্ববর্তী শাসনামলের রেখে যাওয়া সংকটের কথা বলছে, যা আংশিক সত্য হলেও দীর্ঘ ছয় মাস পর এই ব্যাখ্যা জনগণের কাছে যথেষ্ট নয়। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট আর নিজের সময়ে সমাধানের দায়—এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।
এ পরিস্থিতিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপি সরকারের কাছে আমাদের কিছু প্রত্যাশা রয়েছে। প্রথমত, জ্বালানি খাতে স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি গ্যাস অনুসন্ধান, সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তি নিশ্চিত করে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক পরিকল্পনা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে পুলিশ প্রশাসনকে পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। প্রতি ছয় মাস অন্তর সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে একটি জনসম্মুখ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে, যাতে জনগণ নিজেই বিচার করতে পারে—সরকার কোথায় সফল আর কোথায় পিছিয়ে।
বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলায় আজকের দিনটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক। তবে ইতিহাস একটি দলকে শুধু তার সংগ্রামের ইতিহাস দিয়েই মনে রাখে না; বরং ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্র ও জনগণের মানোন্নয়নে কতটুকু ভূমিকা রাখে, তার ওপরও নির্ভর করে।
জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার কতটা আন্তরিক ও কার্যকর, তার ওপরই নির্ভর করবে এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রকৃত তাৎপর্য। প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের দূরত্ব ঘোচানোই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বলে আমরা মনে করছি।
কেকে/ এমএস